
ফরিদুল আলম পিন্টু:
বিশ্ব জাদুঘর দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ডাকে ঢাকা গিয়েছিলাম ২০০৮ সালের ১৬ মে তারিখে সদ্য প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশিষ্ট সমাজকর্মী ওহিদুর রহমানের সাথে। আমাদের সাথে আরো আকজন ছিলেন তিনি আত্রাইয়ের সমাজকর্মী ডিএস জাহিদুল ইসলাম। আমরা গিয়েছিলাম আত্রাইয়ের ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’ এর পক্ষ থেকে।
জনাব ওহিদুর রহমান আমাকে বললেন, ‘আত্রাই খাদি প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত কয়েকটি ‘চরকা’র মধ্য থেকে একটি ‘চরকা’ ভালো করে প্যাকেট করো, চরকাটি ঢাকা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দিতে হবে।’ তাঁর নির্দেশে একটি চরকা গুদামঘর থেকে বের করে প্যাকেট করলাম। উল্লেখ্য, এই চরকাগুলো মহাত্মা গান্ধি ও প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ব্যবহার করতেন।
২০০৮ সালে বিশ্ব জাদুঘর দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সমাজ-বিকাশ ও পরিবর্তনে অবদান রচনায় জাদুঘর’। বাংলাদেশের একটি অবহেলিত ও অনালোচিত ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান সমাজ বিকাশ ও পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে ১৯২২ সালে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কর্তৃক আত্রাইয়ে স্থাপিত হয় ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’। এই প্রতিষ্ঠানকে খাদি প্রতিষ্ঠান নামেই মানুষ বেশী চিনে। সাম্প্রতিককালে এটাকে গান্ধি আশ্রমও বলা হয়।
মুক্তিযুদ্ধজাদুঘরের এবারের আয়োজনটি ছিল আত্রাইয়ের ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’ কে কেন্দ্র করে। ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’র আত্মবিকাশের তাগিদকে সম্মান জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আলোচনা-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি তখন ছিল সেগুনবাগিচায়। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ আমাদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করেন সেগুনবাগিচায় অবস্থিত নিউইয়র্ক আবাসিক হোটেলে। সান্তাহার জংশন রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঢাকাগামী রাতের একটি ট্রেনে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। প্রায় সারারাত ট্রেনের পাশের সিটে বসা বীর মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুর রহমানের সাথে অনেক কথা হলো। আলাপ প্রসঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনেক প্রশংসা করলেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাষ্টি ও সদস্য সচিব বিশিষ্ট লেখক মফিদুল হক সাহেবের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘মফিদুল ভাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
১৭ মে সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমরা উপস্থিত হলাম। মঞ্চের সামনের দর্শকসারির পেছনের দিকে আমি ও আত্রাইয়ের সেই ডিএস জাহিদুল ইসলাম বসলাম। ওহিদুর রহমান সাহেব জাদুঘর নেতৃবৃন্দের সাঙ্গে মঞ্চের উপর আসন গ্রহন করলেন। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় তিন নবীন শিল্পী সুনন্দা, সুকান্ত ও সেতুর সমবেত রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাষ্টি জিয়উদ্দিন তারিক আলী স্বাগত বক্তব্য দেন। এরপর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল ইসলাম ছিলেন আত্রাইয়ের ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক।
আসাদুজ্জামান নূর তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘একটি মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠান তাঁর নেতৃত্বে কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরে পায়। ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’র বিরুদ্ধে অনেক সময় বিভিন্ন ধরণের ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু খায়রুল ইসলামের বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য কেউ এর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুতে ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’র অপূরণীয় ক্ষতি হলো। আমরা তাঁর আরদ্ধ কাজকে সুসম্পন্ন করার অঙ্গীকার ঘোষণা করছি।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মী রণজিত কুমার ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’র বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি সরেজমিন প্রতিবেদন পড়েন। এর পর হঠাৎ করে মঞ্চ থেকে মাইকে ঘোষণা করা হলো, ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’র পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করবেন ফরিদুল আলম পিন্টু। আচমকা এ ঘোষণায় আমি হতবাক হয়ে গেলাম। কেননা ইতিপূর্বে আমাকে কখনও বলা হয়নি যে, আমাকে বক্তব্য দিতে হবে। সেজন্য পেছনের সারিতে বসে খুব মনযোগ সহকারে গুণীজনদের বক্তব্য শুনছিলাম। যাই হোক ঘোষণার পর সাহস সঞ্চয় করে মঞ্চে গিয়ে বক্তব্য দিলাম। বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নিচে নামতেই নেতৃবৃন্দ আমাকে মঞ্চের একটি আসনে বসতে বললেন। বসার পর পাশে উপবিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুর রহমান আমাকে কানে কানে বললেন, ‘প্রস্তুতি ছাড়াই তুমি তো ভালোই বক্তৃতা দিলে।’ এ কথা শুনে আমি পুলকিত হলাম।
সবশেষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাষ্টি মফিদুল হক ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’র ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। এর পর সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ‘চরকা’টি ‘বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি’র পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে প্রদান করা হয়। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠাতা তিনজন ট্রষ্টি মফিদুল হক, আসাদুজ্জামান নূর, জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুর রহমান ও ফরিদুল আলম পিন্টু। এই চরকাটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
প্রতিবেদকের নাম 













