বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬,
২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আত্রাইয়ে খুনের ঘটনার আড়াই ঘন্টা আগে বৈঠক বসেছিল জয়ের বাসায় 

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ০৮:৫১:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
  • ৩৫২ বার পড়া হয়েছে

আত্রাই উপজেলার কাশিয়াবাড়ী এলাকায় বলরামচক চৌধুরী পাড়ায় স্বামী রাজ সরকার জয় (২৫),স্ত্রী দৃষ্টিরাণী সরকার (২২) এবং শিশু কন্যা জেনি সরকার (২) ছুরিকাঘাতের অন্তত: দুই/আড়াই ঘন্টা আগে রাজ সরকার জয়ের বাসায় বৈঠক বসেছিল বলে দাবি করেছেন দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার। এছাড়া প্রেম করে বিয়ের পর থেকে সংসারে দৃষ্টিরাণীকে পরিবারের লোকজন মেনে না নিতে পারা এবং যৌতুকের টাকার জন্য বার বার দ্বন্দ্ব হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার। রবি সরকার দিনাজপুর জেলা সদরের গোপালগঞ্জ মহল্লার কৃষ্ণ বাহাদুরের ছেলে।

রবি সরকার বলেন,গত ৫বছর আগে প্রেমের সর্ম্পকে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে বিয়ে করে জয় সরকার। এর পর থেকে জয়ের পরিবারের লোকজন দৃষ্টিরাণীকে ঠিকঠাক মেনে নিতে পারছিলনা। ফলে অনায়াসে পরিবারের লোকজন দৃষ্টিরাণীকে নানাভাবে নির্যাতন করতো। তিনি বলেন,বিয়ের দেড় মাস পর মেয়ে-জামায় বেড়াতে আসলে তাদেরকে ভাল থাকার জন্য তিন লাখ টাকা এবং এক ভরি স্বর্ণের গহনা দিতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা এবং এক ভরি স্বর্ণালঙ্কার দিয়েছেন। কিন্তু অবশিষ্ট এক লাখ টাকা দিতে না পারায় বার বার টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিল জয়ের পরিবার। এরই মধ্যে তাদের সংসারে এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। গত দেড় বছর ধরে দৃষ্টিকে বাবার বাড়ীতে যেতে দেয়নি। অনেক অনুরোধের ফলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন আগে জয়ের বাবা গৌতম সরকার সান্তাহার স্টেশনে পৌছে দেয় দৃষ্টিরাণীকে। এর পর দৃষ্টিরাণী জয়ের সংসারে যেতে রাজী হয়নি। নিহত দৃষ্টিরাণীর বরাদ দিয়ে বাবা রবি সরকার বলেন, জয় ছিল জ্বেদি এবং বিলাসী। প্রায়ই বাবার নিকটে চাপ দিয়ে কখনো ৫০হাজার আবার কখনো এক লাখ টাকা পর্যন্ত নিতো জয়। এসব ঘটনায় দৃষ্টিরাণীকে দায়ি করে তার উপর শারীরিক এবং মানষিক নির্যাতন করতো জয়ের পরিবারের লোকজন। এতে অতিষ্ট হয়ে জয়ের সংসার করবেনা বলে সাফ জানিয়ে দেয় দৃষ্টিরাণী। কিন্তু এধরনের আর ঘটনা ঘটবেনা জানিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে ঘটনার ১০দিন আগে দৃষ্টিরাণীকে সংসারে ফিরে নিয়ে আসে জয়। কিন্তু এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মোবাইল ফোনে জানতে পারি মেয়ে দৃষ্টিরাণী সরকারকে এবং নাতনি জেনি সরকারকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তবে কি কারণে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে তা কেউ জানায়নি। শুক্রবার দুপুরে আত্রাই থানায় এসে মেয়ে দৃষ্টিরাণী সরকারের নিথর দেহ দেখতে পাই। তিনি বলেন,আমার জামায় রাজ সরকার জয় আমার মেয়ে এবং নাততিকে হত্যা করতে পারেনা এবং জয় নিজেও ছুরিকাঘাতে আত্মহত্যা করতে পারেনা। জয় আমার মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করেছে। তিনি ধারনা করে বলেন,পরিবারের লোকজন হয়তো কোন কারণে আমার মেয়ে,মেয়ের-জামায় এবং নাতনিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। রবি সরকার দাবি করে বলেন,স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে ঘটনার রাতে জয়দের বাসায় একটি বৈঠক বসেছিল। এই বৈঠকের দুই আড়াই ঘন্টা পরেই এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছে। তবে কি নিয়ে বৈঠক হয়েছে তা জানতে পারেননি বলে জানান রবি সরকার। খুনের ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার পেতে তিনি বাদী হয়ে দৃষ্টিরাণীর শ্বশুড়-শ্বাশুড়িসহ চারজনকে আসামী করে শুক্রবার রাতে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এছাড়া জয়ের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা গৌতম সরকার বাদী হয়ে অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন। দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

বলরামচক এলাকার স্থানীয় মেম্বার গোলাম মোস্তফা বলেন,জয়ের বাড়ীতে ওই রাতে বৈঠকের কথা আমার জানা নেই। সাবেক মেম্বার স্বপন কুমার বলেন,জয় মাদকাসক্ত ছিল। তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির ব্যপারে আমরা পারিবারিকভাবে বৈঠকে বসেছিলাম। সেখান থেকে চলে আসার পর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া অন্য কিছু আমার জানা নেই।

জয়ের মা চায়না রাণী সরকার বলেন,ঘটনার ২/৩দিন আগে একটি টেলিভিশন ভেঙ্গে ফেলে জয়। সে যেনো আর ভাংচুর না করে এসব বিষয় নিয়ে বসা হয়েছিল। এর পর সবাই চলে গেলে দুই/আড়াই ঘন্টা পর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহাজুল ইসলাম বলেন,ওই রাতে বৈঠকের কথা শুনেছি। কারা বৈঠকে ছিল এবং কি নিয়ে বৈঠক বসেছিল এগুলো তদন্ত চলছে। এর পাশা পাশি অন্যনান্য বিষয়গুলো ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য,গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ রাজ সরকার জয়ের স্ত্রী দৃষ্টিরাণী সরকারের চিৎকারে লোকজন ছুটে যায়। এর পর দৃষ্টিরাণী সরকার,শিশু কন্যা জেনি সরকার এবং জয়কে গলায়,পিঠে ও বুকে ছুরিকাঘাতে গুরুত্বর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে আত্রাই হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা দৃষ্টিরাণীকে মৃত্যু ঘোষনা করেন। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশু কন্যা জেনি এবং জয়কে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে। সেখানে রাতেই শিশু কন্যা জেনি সরকার এবং শুক্রবার সকাল ৮টা নাগাদ জয় সরকারা মারা যায়।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

আত্রাইয়ে খুনের ঘটনার আড়াই ঘন্টা আগে বৈঠক বসেছিল জয়ের বাসায় 

প্রকাশের সময় : ০৮:৫১:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

আত্রাই উপজেলার কাশিয়াবাড়ী এলাকায় বলরামচক চৌধুরী পাড়ায় স্বামী রাজ সরকার জয় (২৫),স্ত্রী দৃষ্টিরাণী সরকার (২২) এবং শিশু কন্যা জেনি সরকার (২) ছুরিকাঘাতের অন্তত: দুই/আড়াই ঘন্টা আগে রাজ সরকার জয়ের বাসায় বৈঠক বসেছিল বলে দাবি করেছেন দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার। এছাড়া প্রেম করে বিয়ের পর থেকে সংসারে দৃষ্টিরাণীকে পরিবারের লোকজন মেনে না নিতে পারা এবং যৌতুকের টাকার জন্য বার বার দ্বন্দ্ব হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার। রবি সরকার দিনাজপুর জেলা সদরের গোপালগঞ্জ মহল্লার কৃষ্ণ বাহাদুরের ছেলে।

রবি সরকার বলেন,গত ৫বছর আগে প্রেমের সর্ম্পকে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে বিয়ে করে জয় সরকার। এর পর থেকে জয়ের পরিবারের লোকজন দৃষ্টিরাণীকে ঠিকঠাক মেনে নিতে পারছিলনা। ফলে অনায়াসে পরিবারের লোকজন দৃষ্টিরাণীকে নানাভাবে নির্যাতন করতো। তিনি বলেন,বিয়ের দেড় মাস পর মেয়ে-জামায় বেড়াতে আসলে তাদেরকে ভাল থাকার জন্য তিন লাখ টাকা এবং এক ভরি স্বর্ণের গহনা দিতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা এবং এক ভরি স্বর্ণালঙ্কার দিয়েছেন। কিন্তু অবশিষ্ট এক লাখ টাকা দিতে না পারায় বার বার টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিল জয়ের পরিবার। এরই মধ্যে তাদের সংসারে এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। গত দেড় বছর ধরে দৃষ্টিকে বাবার বাড়ীতে যেতে দেয়নি। অনেক অনুরোধের ফলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন আগে জয়ের বাবা গৌতম সরকার সান্তাহার স্টেশনে পৌছে দেয় দৃষ্টিরাণীকে। এর পর দৃষ্টিরাণী জয়ের সংসারে যেতে রাজী হয়নি। নিহত দৃষ্টিরাণীর বরাদ দিয়ে বাবা রবি সরকার বলেন, জয় ছিল জ্বেদি এবং বিলাসী। প্রায়ই বাবার নিকটে চাপ দিয়ে কখনো ৫০হাজার আবার কখনো এক লাখ টাকা পর্যন্ত নিতো জয়। এসব ঘটনায় দৃষ্টিরাণীকে দায়ি করে তার উপর শারীরিক এবং মানষিক নির্যাতন করতো জয়ের পরিবারের লোকজন। এতে অতিষ্ট হয়ে জয়ের সংসার করবেনা বলে সাফ জানিয়ে দেয় দৃষ্টিরাণী। কিন্তু এধরনের আর ঘটনা ঘটবেনা জানিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে ঘটনার ১০দিন আগে দৃষ্টিরাণীকে সংসারে ফিরে নিয়ে আসে জয়। কিন্তু এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মোবাইল ফোনে জানতে পারি মেয়ে দৃষ্টিরাণী সরকারকে এবং নাতনি জেনি সরকারকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তবে কি কারণে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে তা কেউ জানায়নি। শুক্রবার দুপুরে আত্রাই থানায় এসে মেয়ে দৃষ্টিরাণী সরকারের নিথর দেহ দেখতে পাই। তিনি বলেন,আমার জামায় রাজ সরকার জয় আমার মেয়ে এবং নাততিকে হত্যা করতে পারেনা এবং জয় নিজেও ছুরিকাঘাতে আত্মহত্যা করতে পারেনা। জয় আমার মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করেছে। তিনি ধারনা করে বলেন,পরিবারের লোকজন হয়তো কোন কারণে আমার মেয়ে,মেয়ের-জামায় এবং নাতনিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। রবি সরকার দাবি করে বলেন,স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে ঘটনার রাতে জয়দের বাসায় একটি বৈঠক বসেছিল। এই বৈঠকের দুই আড়াই ঘন্টা পরেই এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছে। তবে কি নিয়ে বৈঠক হয়েছে তা জানতে পারেননি বলে জানান রবি সরকার। খুনের ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার পেতে তিনি বাদী হয়ে দৃষ্টিরাণীর শ্বশুড়-শ্বাশুড়িসহ চারজনকে আসামী করে শুক্রবার রাতে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এছাড়া জয়ের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা গৌতম সরকার বাদী হয়ে অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন। দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

বলরামচক এলাকার স্থানীয় মেম্বার গোলাম মোস্তফা বলেন,জয়ের বাড়ীতে ওই রাতে বৈঠকের কথা আমার জানা নেই। সাবেক মেম্বার স্বপন কুমার বলেন,জয় মাদকাসক্ত ছিল। তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির ব্যপারে আমরা পারিবারিকভাবে বৈঠকে বসেছিলাম। সেখান থেকে চলে আসার পর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া অন্য কিছু আমার জানা নেই।

জয়ের মা চায়না রাণী সরকার বলেন,ঘটনার ২/৩দিন আগে একটি টেলিভিশন ভেঙ্গে ফেলে জয়। সে যেনো আর ভাংচুর না করে এসব বিষয় নিয়ে বসা হয়েছিল। এর পর সবাই চলে গেলে দুই/আড়াই ঘন্টা পর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহাজুল ইসলাম বলেন,ওই রাতে বৈঠকের কথা শুনেছি। কারা বৈঠকে ছিল এবং কি নিয়ে বৈঠক বসেছিল এগুলো তদন্ত চলছে। এর পাশা পাশি অন্যনান্য বিষয়গুলো ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য,গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ রাজ সরকার জয়ের স্ত্রী দৃষ্টিরাণী সরকারের চিৎকারে লোকজন ছুটে যায়। এর পর দৃষ্টিরাণী সরকার,শিশু কন্যা জেনি সরকার এবং জয়কে গলায়,পিঠে ও বুকে ছুরিকাঘাতে গুরুত্বর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে আত্রাই হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা দৃষ্টিরাণীকে মৃত্যু ঘোষনা করেন। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশু কন্যা জেনি এবং জয়কে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে। সেখানে রাতেই শিশু কন্যা জেনি সরকার এবং শুক্রবার সকাল ৮টা নাগাদ জয় সরকারা মারা যায়।