
উত্তর জনপদের জেলা নওগাঁর আত্রাইয়ের জামগ্রামে আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সীতাতলার মেলা। প্রতি বছর বাংলা পৌষ মাসের শেষ তারিখে এখানে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামটি পল্লীতে হলেও এ মেলার কারণে গ্রামের খ্যাতি রয়েছে উত্তরবঙ্গ জুড়ে।
উপজেলার সর্ববৃহৎ এ মেলাকে ঘিরে এখন জামগ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে চলছে উৎসবের আমেজ।
আত্রাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার উত্তরে নিভৃত পল্লী জামগ্রাম। আত্রাইয়ের আহসানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন পার হয়ে ভোঁপাড়া তিলাবদুরী হয়ে মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, ইজিবাইক, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে যাওয়া সম্ভব। অপরদিকে কাশিয়াবাড়ী সুইচ গেট হয়ে নাগবাড়ী হয়েও জামগ্রাম যাওয়া যায়। এই জামগ্রামেই সেই যুগ যুগ থেকে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে সীতাতলার মেলা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আজ বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সীতাতলার মেলা।

কথিত আছে, শত শত বছর পূর্বে রামচন্দ্র তার স্ত্রী সীতা রাণীকে এখানে বনবাস দিয়েছিলেন। আর সীতা বনবাসের এক পর্যায়ে জামগ্রামের বিশাল বনে একটি প্রকাণ্ড বটগাছের নিচে আশ্রয় নেন এবং বাকি সময় এ গাছটির নিচেই নাকি তিনি কাটিয়ে দেন। এর পাশে ছিল এক বিরাট ইন্দারা। সীতা এই ইন্দারার পানিতেই নাকি স্নান করতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই বটগাছটিও আর নেই, ইন্দারাটিও আর নেই। এ কারণে তদানীন্তন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা সীতার নামে ওই বটগাছটির নিচে পূজা শুরু করেন। পরবর্তীতে এটি আর শুধু পূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আস্তে আস্তে বৃহৎ মেলা অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। আর সীতার নামেই মেলার নামকরণ করা হয়েছে ‘সীতাতলার মেলা’। শুরুর দিকে এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের মেলা থাকলেও বর্তমানে আর তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এ মেলা হিন্দু, মুসলিম সকলের এক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। মেলাকে ঘিরে নওগাঁসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়।
মূল মেলা তিনদিন হলেও মেলার আগেও পরে কয়েকদিন ব্যাপী চলে মেলার বেচা-কেনা। মেলাকে ঘিরে উপজেলার জামগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে এখন সাজসাজ রব পড়ে গেছে। মেলা উপলক্ষে যেন আশপাশের গ্রামগুলোতে উৎসবের ধুম পড়েছে। দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনে ভরে গেছে প্রায় প্রতিটি বাড়ি। প্রতি বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের মিঠাই মিষ্টান্ন পিঠা ও ভালো খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

মেলাকে ঘিরে আশপাশের গ্রামে জামাই আদর রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ঘরে ঘরে শীতের রস-পাটালির নানান পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম। ঈদে না হলেও অন্তত মেলা উপলক্ষে জামাই-মেয়েকে দাওয়াত দেওয়া এ এলাকার রেওয়াজ। জামাই মেলা থেকে বড় মাছ-মিষ্টি নিয়ে শ্বশুরালয়ে যান। আর শ্বশুর জামাইকেও উপহার দিয়ে থাকেন। তাই জামগ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে এখন জামাই, মেয়ে বিয়াই, বিয়ানসহ আত্মীয় স্বজনের পদচারণায় মুখরিত।
ঐতিহাসিক এ মেলাকে কেন্দ্র করে জেলা সদরসহ পার্শ্ববর্তী বগুড়া, সান্তাহার, নাটোর, জয়পুরহাট, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর লোকজন এই মেলাই বেড়াতে এসে ব্যাপক কেনা-কাটাও করে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 








