
একদিকে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় কাজের ব্যস্ততা, অন্যদিকে শত শত চঞ্চল শিক্ষার্থীর হইচই সবকিছুর মাঝেও এক টুকরো শান্তির ছায়া হয়ে ছিলেন শেফালি বেগম। পদমর্যাদায় তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের ‘আয়া’। তবে দীর্ঘ ৩৪ বছরের একনিষ্ঠ ও মমতাময়ী সেবায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় ‘শেফালি খালা’।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গেলেন তিনি। তার বিদায়কে ঘিরে বিদ্যালয়জুড়ে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত বিদায়ে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
বিদায়ের পর সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হয় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সাধারণত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা প্রধান শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু শেফালি বেগমের ক্ষেত্রে ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় সৃষ্টি করেছে অনন্য দৃষ্টান্ত। তাকে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়িতে পৌঁছে দেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
ঘোড়ার গাড়িতে ওঠার সময় শিক্ষার্থীরা তার ওপর ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে সম্মান জানায়। শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বাড়ির পথে রওনা দেন শেফালি বেগম। এ সময় অনেক শিক্ষার্থীকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে আবেগঘন।
ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত শেফালি বেগমের নিজের কোনো সংসার বা সন্তান নেই। তবে বিদ্যালয়ই ছিল তার পরিবার। বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তিনি নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। পরম মমতায় শিক্ষার্থীদের টিফিনের খোঁজ নেওয়া, ভুলত্রুটি শুধরে দেওয়া কিংবা কেউ অসুস্থ হলে মায়ের মতো যত্ন নেওয়া—এসব কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার নয়নের মণি। শিক্ষকদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেও কখনো ক্লান্তিকে গুরুত্ব দেননি তিনি।
দীর্ঘদিন আড়ালে থেকে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা শেফালি বেগমের অবসর উপলক্ষে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাকে যথাযথ সম্মান জানায়। বিদায়ী অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। শ্রদ্ধার স্মারক হিসেবে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সংবর্ধনা উত্তরীয়, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী।
এ উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আড়ম্বরপূর্ণ বিদায়ী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন নওগাঁ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম মিঠু।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুল ইসলাম, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য লিটন হোসেন, অন্যান্য অতিথি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম মিঠু বলেন, “শেফালি বেগম আমাদের বিদ্যালয়ের শুধু একজন কর্মচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম এক স্তম্ভ। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে তিনি যেভাবে প্রতিটি শিক্ষককে সম্মান করেছেন এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সন্তানের মতো ভালোবেসে আগলে রেখেছেন, তা আমাদের সবার জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। পদের দিক থেকে কেউ বড় বা ছোট হতে পারে, কিন্তু তার কর্তব্যপরায়ণতা এবং মমত্ববোধ আমাদের সবার চেয়ে অনেক উঁচুতে। তার এই নিঃস্বার্থ সেবার ঋণ ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় কোনো দিন শোধ করতে পারবে না। আমরা তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।”
বিদায়ী বক্তব্যে শেফালি বেগম বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার জন্য দোয়া কামনা করেন। দীর্ঘ ৩৪ বছরের কর্মস্থল থেকে বিদায়ের মুহূর্তে আবেগাপ্লুত হয়ে
পড়েন তিনি।
নিজস্ব প্রতিবেদক নওগাঁ 








