বুধবার, ১৩ মে ২০২৬,
৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস ইউএনও'র

এক প্রজন্ম কারাগারে, মুক্তির দিনে রাহেলা বৃদ্ধা ও নিঃস্ব

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ০৬:২৫:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২৪৬ বার পড়া হয়েছে

মানুষের জীবনে ২৮ বছর মানে একটি পূর্ণ প্রজন্ম। কারও জীবনে এ সময়টা কাটে পরিবার, সন্তান, সুখ-দুঃখ আর স্বপ্ন বুননের মধ্য দিয়ে। অথচ, একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জীবনে দীর্ঘ ২৮ বছর চার দেয়ালের অন্ধকার কাটালেন ৬৫ বছর বয়সি রাহেলা বেগম। দীর্ঘ এত বছর কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি পেলেন রাহেলা বেগম। রাহেলা বেগমের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামে।

কারাগার সূত্রে ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাহেলা বেগমের বিরুদ্ধে ১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলা করা হয়। সে সময় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। গ্রেফতারের পর শুরু হয় তার দীর্ঘ কারাজীবন। স্বামী, সন্তান কিংবা নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি না থাকায় কারাগারের চার দেয়ালই হয়ে ওঠে তার জীবন। মাঝেমধ্যে বড় বোন সায়েলা জেলগেটে গিয়ে তার খোঁজ নিলেও অধিকাংশ সময় একাই কাটাতে হয়েছে তাকে। গত ১২ জানুয়ারি রাহেলা বেগমের যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ শেষ হয়। তবে মামলায় ধার্য জরিমানার সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা অনাদায়ি থাকায় তাকে আরও প্রায় দুই বছর কারাভোগ করতে হতো। বিষয়টি জানালে অসহায় রাহেলার পক্ষে জরিমানার টাকা পরিশোধ করা যে অসম্ভব, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় মানবিক বিবেচনায় এগিয়ে আসে কারা কর্তৃপক্ষ। জরিমানার সাড়ে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেন জেল সুপার। পরে রাহেলা বেগমকে বোন জামাইয়ের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে। বর্তমানে এ বৃদ্ধা বড় বোনের বাড়িতেই আছেন।

রাহেলা বেগম যখন জেলে প্রবেশ করেন, তখন বয়স ছিল মধ্য বয়সের কোঠায়। চুল ছিল কালো, শরীরে ছিল শক্তি, চোখে ছিল ভবিষ্যতের অনিশ্চিত অভয়। সময়ের নির্মম ঘূর্ণিতে আজ তিনি একজন বৃদ্ধা, চুলে পাকা ধরা, শরীর ভেঙে পড়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল এক বৃদ্ধা। অনেক সময় নিজের প্রতিবেশীদেরও চিনতে পারেন না। ২৮ বছর আগের রাহেলাকে কোনোভাবেই মিলাতে পারছে না স্থানীয় বাসিন্দারা। তবুও এই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ের মাঝেও একটি স্বপ্ন আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন, কোনো একদিন মুক্ত আকাশে শ্বাস নেবেন।

কারাজীবনের কথা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহেলা বেগম। কান্না কণ্ঠে তিনি বলেন,‘কারাগারের ভেতরে বসে প্রতিটি মুহূর্ত মুক্তির অপেক্ষায় কাটিয়েছেন। কোনো কিছুই মিলাতে পারতাম না। খুব কাঁদতাম। এর বেশি কিছু বলার শক্তি পাননি তিনি।’

রাহেলার বড় বোন সাহেলা বেগম বলেন, ‘এই পৃথিবীতে রাহেলার আপন বলতে এখন আমি ছাড়া কেউ নেই। জেলে থাকা অবস্থায় আমাদের বাবা-মা মারা গেছেন। তার স্বামী অন্যত্র সংসার গড়েছেন। জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার বাড়িতেই ঠাঁই হয়েছে তার।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারিভাবে যদি কোনো সহযোগিতা পাওয়া যেত, তাহলে জীবনের শেষ সময়ে অন্তত খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারত। সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমি অনুরোধ জানাই, মানবিক দৃষ্টিতে যেন তারা এগিয়ে আসেন।

এ বিষয়ে আহসানগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু বলেন, আপনার মাধ্যমেই বিষয়টি জানতে পারলাম। যেহেতু বিষয়টি আমার ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত, আমি এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মোঃ আলাউল ইসলাম আমাদের আত্রাই কে বলেন, “রাহেলা বেগমের বিষয়টি আমি আজই অবগত হয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহায়তা ও শুকনো খাবার প্রদান করা হবে। প্রয়োজনে তার জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।”

নওগাঁর জেল সুপার রত্না রায় বলেন, ‘রাহেলা বেগমের সশ্রম কারাদণ্ডের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু আদালতের ধার্য করা পাঁচ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে না পারায় তার মুক্তি আটকে ছিল। কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশনায় ওই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হলে গত ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। আমরা চাই, জীবনের বাকি সময়টা তিনি স্বাভাবিকভাবে কাটাতে পারেন।’

 

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

আত্রাইয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভ্রাম্যমাণ টিসিবির পণ্য বিক্রি 

পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস ইউএনও'র

এক প্রজন্ম কারাগারে, মুক্তির দিনে রাহেলা বৃদ্ধা ও নিঃস্ব

প্রকাশের সময় : ০৬:২৫:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

মানুষের জীবনে ২৮ বছর মানে একটি পূর্ণ প্রজন্ম। কারও জীবনে এ সময়টা কাটে পরিবার, সন্তান, সুখ-দুঃখ আর স্বপ্ন বুননের মধ্য দিয়ে। অথচ, একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জীবনে দীর্ঘ ২৮ বছর চার দেয়ালের অন্ধকার কাটালেন ৬৫ বছর বয়সি রাহেলা বেগম। দীর্ঘ এত বছর কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি পেলেন রাহেলা বেগম। রাহেলা বেগমের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামে।

কারাগার সূত্রে ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাহেলা বেগমের বিরুদ্ধে ১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলা করা হয়। সে সময় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। গ্রেফতারের পর শুরু হয় তার দীর্ঘ কারাজীবন। স্বামী, সন্তান কিংবা নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি না থাকায় কারাগারের চার দেয়ালই হয়ে ওঠে তার জীবন। মাঝেমধ্যে বড় বোন সায়েলা জেলগেটে গিয়ে তার খোঁজ নিলেও অধিকাংশ সময় একাই কাটাতে হয়েছে তাকে। গত ১২ জানুয়ারি রাহেলা বেগমের যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ শেষ হয়। তবে মামলায় ধার্য জরিমানার সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা অনাদায়ি থাকায় তাকে আরও প্রায় দুই বছর কারাভোগ করতে হতো। বিষয়টি জানালে অসহায় রাহেলার পক্ষে জরিমানার টাকা পরিশোধ করা যে অসম্ভব, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় মানবিক বিবেচনায় এগিয়ে আসে কারা কর্তৃপক্ষ। জরিমানার সাড়ে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেন জেল সুপার। পরে রাহেলা বেগমকে বোন জামাইয়ের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে। বর্তমানে এ বৃদ্ধা বড় বোনের বাড়িতেই আছেন।

রাহেলা বেগম যখন জেলে প্রবেশ করেন, তখন বয়স ছিল মধ্য বয়সের কোঠায়। চুল ছিল কালো, শরীরে ছিল শক্তি, চোখে ছিল ভবিষ্যতের অনিশ্চিত অভয়। সময়ের নির্মম ঘূর্ণিতে আজ তিনি একজন বৃদ্ধা, চুলে পাকা ধরা, শরীর ভেঙে পড়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল এক বৃদ্ধা। অনেক সময় নিজের প্রতিবেশীদেরও চিনতে পারেন না। ২৮ বছর আগের রাহেলাকে কোনোভাবেই মিলাতে পারছে না স্থানীয় বাসিন্দারা। তবুও এই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ের মাঝেও একটি স্বপ্ন আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন, কোনো একদিন মুক্ত আকাশে শ্বাস নেবেন।

কারাজীবনের কথা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহেলা বেগম। কান্না কণ্ঠে তিনি বলেন,‘কারাগারের ভেতরে বসে প্রতিটি মুহূর্ত মুক্তির অপেক্ষায় কাটিয়েছেন। কোনো কিছুই মিলাতে পারতাম না। খুব কাঁদতাম। এর বেশি কিছু বলার শক্তি পাননি তিনি।’

রাহেলার বড় বোন সাহেলা বেগম বলেন, ‘এই পৃথিবীতে রাহেলার আপন বলতে এখন আমি ছাড়া কেউ নেই। জেলে থাকা অবস্থায় আমাদের বাবা-মা মারা গেছেন। তার স্বামী অন্যত্র সংসার গড়েছেন। জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার বাড়িতেই ঠাঁই হয়েছে তার।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারিভাবে যদি কোনো সহযোগিতা পাওয়া যেত, তাহলে জীবনের শেষ সময়ে অন্তত খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারত। সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমি অনুরোধ জানাই, মানবিক দৃষ্টিতে যেন তারা এগিয়ে আসেন।

এ বিষয়ে আহসানগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু বলেন, আপনার মাধ্যমেই বিষয়টি জানতে পারলাম। যেহেতু বিষয়টি আমার ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত, আমি এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মোঃ আলাউল ইসলাম আমাদের আত্রাই কে বলেন, “রাহেলা বেগমের বিষয়টি আমি আজই অবগত হয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহায়তা ও শুকনো খাবার প্রদান করা হবে। প্রয়োজনে তার জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।”

নওগাঁর জেল সুপার রত্না রায় বলেন, ‘রাহেলা বেগমের সশ্রম কারাদণ্ডের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু আদালতের ধার্য করা পাঁচ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে না পারায় তার মুক্তি আটকে ছিল। কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশনায় ওই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হলে গত ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। আমরা চাই, জীবনের বাকি সময়টা তিনি স্বাভাবিকভাবে কাটাতে পারেন।’