
চলতি মৌসুমে সময়মত বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সোনালি আঁশ খ্যাত পাটের অধিক ফলন হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় খরিপ-১ মৌসুমে উৎপাদিত পাটের আশাতীত বাজারমূল্য পেয়ে নওগাঁ জেলার কৃষকরা আনন্দে উচ্ছ্বসিত।
বিগত পাঁচ বছর ধারাবাহিকভাবে পাট চাষের পরিমাণ কমে গেলেও এ বছর ভালো দাম, সরকারি প্রণোদনা এবং সর্বোপরি পাটের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারসহ সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে আগামী মৌসুমে কৃষকরা পাট চাষে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
কমেছে আবাদ, কমেছে উৎপাদন
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২০২২ মৌসুমে জেলায় পাটের আবাদ হয়েছিল ৫,৭২৫ হেক্টর জমিতে। ওই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ১৫,৫৬০ মেট্রিক টন পাট।
২০২২-২০২৩ মৌসুমে পাটের আবাদ কমে দাঁড়ায় ৫,৩৩০ হেক্টরে এবং উৎপাদন হয় ১৪,৬৫০ মেট্রিক টন।
২০২৩-২০২৪ মৌসুমে ৪,৫৬০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করে উৎপাদন হয় ১২,৭১০ মেট্রিক টন।
২০২৪-২০২৫ মৌসুমে পাটের আবাদ আরও কমে ৩,৫৫০ হেক্টরে দাঁড়ায়। ওই মৌসুমে উৎপাদিত হয় ৯,৯৬৫ মেট্রিক টন পাট।

চলতি ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে জেলায় পাটের আবাদ হয়েছে ৩,১৭০ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮,৯৪০ মেট্রিক টন পাট।
মৌসুমের শুরুতেই ভালো দাম
ইতোমধ্যে জেলার কৃষকরা জমি থেকে পাট কেটে জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়িয়ে শুকিয়ে বাজারজাত করতে শুরু করেছেন। মৌসুমের শুরুতেই ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে সন্তুষ্টি দেখা দিয়েছে।
জেলার বিভিন্ন বাজারে প্রতি মণ শুকনা পাট ৩ হাজার ৮শ’ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বিঘায় পাটের আবাদ করতে জমি চাষ, বীজ, সার, পরিচর্যা, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, ধোয়া ও শুকানোসহ গড়ে খরচ হয়েছে ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি নিট লাভ হচ্ছে ৩০ হাজার থেকে ৩২ হাজার টাকা।
কৃষকরা বলছেন, গত ৫-৬ বছরের মধ্যে পাট চাষ করে এ বছরই তারা ভালো লাভ করছেন। অধিক পাট ফলনের মাধ্যমে পাট যে সত্যিই ‘সোনালি আঁশ’ এ মর্মার্থ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও ফিরে আসতে শুরু করেছে।
কৃষকের ঘরে ফিরছে লাভ
বদলগাছী উপজেলার কাষ্টডোব গ্রামের কৃষক মোবারক আলী শঙ্কা নিয়ে এ বছর ১ বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছেন।
তিনি বাসস’কে বলেন, সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ১৭ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে তিনি পাট উৎপাদন করেছেন ১২ মণ। যার বর্তমান বাজারমূল্য ৪৮ হাজার টাকা। এতে তার নিট লাভ হয়েছে ৩১ হাজার টাকা।
মান্দা উপজেলার বড় বেলালদহ গ্রামের কৃষক আজিমুদ্দিন কাজী ২ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি মোট পাট পেয়েছেন ২২ মণ। প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা দরে তার পাটের মোট বাজারমূল্য ৮৮ হাজার টাকা। দুই বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করতে তার মোট খরচ হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে দুই বিঘা জমিতে তিনি নিট মুনাফা করেছেন ৫৬ হাজার টাকা।
৮০০ কৃষক পেলেন সরকারি প্রণোদনা
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৮শ’ জন কৃষকের প্রত্যেককে ২৩০ টাকা মূল্যের ১ কেজি করে বীজ, ৯৫ টাকা মূল্যের ৫ কেজি ডিএপি সার, ৯০ টাকা মূল্যের ৫ কেজি এমওপি সার এবং পরিবহন বাবদ নগদ ১৬.৫০ টাকা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রণোদনার আওতায় প্রত্যেক কৃষককে ৪৪২.৫০ টাকার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। সেই হিসেবে চলতি মৌসুমে পাট চাষিদের ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
পাটকে আবারও ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁ’র উপ-পরিচালক মো. মনজুর রহমান বাসস’কে বলেন, কৃষি বিভাগ পাটকে আবার সোনালি আঁশ হিসেবে সুপরিচিত করতে পাট চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, এ প্রান্তিক চাষিদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় ৮শ’ জন পাটচাষিকে বিনামূল্যে বীজ, সারসহ পরিবহন খরচ এবং আনুষাঙ্গিক ও অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের জন্য নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক নওগাঁ 

















