
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) স্বর্ণের দাম কমে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) আসন্ন মুদ্রানীতির সিদ্ধান্তকে ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে মূল্যবান এই ধাতুর দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩টা ২ মিনিটে স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৮১ ডলার ৮৯ সেন্টে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডিসেম্বরে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত স্বর্ণের ফিউচার মূল্য ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৯৭ ডলার ৯০ সেন্টে নেমে আসে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা স্বর্ণের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তেলের দাম বাড়ায় বাড়ছে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে হুথি গোষ্ঠীর নতুন হামলার পর আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তৃত হওয়া এবং অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগ দেখা দেয়। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ ডলারের বেশি বেড়েছে।
এএনজেডের বিশ্লেষক সোনি কুমারী বলেন, জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা থাকায় স্বর্ণের দাম আরও কমতে পারে।
সাধারণত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম বিবেচনা করা হয়। তবে সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যায়। কারণ, তখন বিনিয়োগকারীরা সুদ পাওয়া যায় এমন সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা একসঙ্গে স্বর্ণের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ফেডের সুদের হারের সিদ্ধান্তের দিকে নজর
যুক্তরাষ্ট্রে গত সপ্তাহে প্রকাশিত ভোক্তা ও উৎপাদক মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এতে ফেডের কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা বা সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের অধিকাংশের ধারণা, আগামী ২৭ ও ২৮ অক্টোবরের বৈঠকে ফেড আপাতত সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে পারে।
তবে গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বরে ফেড সুদের হার আরও ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা বেড়ে ৪ থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
সিএমইর ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৯১ শতাংশ ধরে নিচ্ছেন বাজারের লেনদেনকারীরা।
মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যের অপেক্ষায় বাজার
আগামী ২৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ভোগব্যয় (পিসিই) মূল্যসূচকের তথ্য প্রকাশের কথা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকের ওপর নজর রাখছে ফেড। নতুন তথ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ সুদের হার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জলবায়ু ও পণ্যবাজারবিষয়ক অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন বলেন, পিসিইর তথ্য মূল্যবৃদ্ধির হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে। এতে ফেডের কর্মকর্তারা কঠোর মুদ্রানীতির পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন, যা স্বর্ণের দামের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
স্বর্ণের পাশাপাশি কমেছে রুপা-প্লাটিনাম-প্যালাডিয়ামের দাম
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে।
বৃহস্পতিবার স্পট মার্কেটে রুপার দাম ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫৫ ডলার ৮৬ সেন্টে নেমে এসেছে।
একই সময়ে প্লাটিনামের দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৫৮৬ ডলার ২২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। এটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ের পর ধাতুটির সর্বনিম্ন দাম।
অন্যদিকে, প্যালাডিয়ামের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৫২ ডলারে নেমেছে। এর আগে ধাতুটির দাম ২০২৫ সালের জুনের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা আপাতত মূল্যবান ধাতুর বাজারে অস্থিরতা বজায় রাখতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারের তথ্য।
আ.আ. নিউজ ডেস্ক 

















