
প্রকৃতিতে বইতে শুরু করেছে শীতের আগমনী হাওয়া। ভোরের কুয়াশা, ঘাসের ডগায় শিশির আর রাতের শেষ ভাগে হালকা শীতলতা জানান দিচ্ছে ঋতু পরিবর্তনের বার্তা। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার পর দেশের আবহাওয়ায় ধীরে ধীরে শীতের প্রভাব বাড়তে শুরু করেছে। তবে আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস বলছে, এবারের শীত হতে পারে তুলনামূলক উষ্ণ। শীতের তীব্রতা কম থাকার পাশাপাশি কমতে পারে শীতকালের স্থায়িত্বও। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এবারের শীত হতে পারে ‘ওয়ার্ম উইন্টার’ বা উষ্ণ শীত।
উত্তরাঞ্চলে কমছে তাপমাত্রা
দেশে শীতের আগমনী বার্তা সবচেয়ে আগে অনুভূত হচ্ছে উত্তরাঞ্চলে। এরই মধ্যে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এসেছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রংপুরেও তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায়ের পর বাতাসের গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তর দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাসের প্রবাহ বাড়লে শীতের অনুভূতিও বাড়তে পারে।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ায় বাতাসে এখন হিম হিম ভাব অনুভূত হচ্ছে। আগামী কয়েক মাস উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হবে। যত বেশি উত্তরের বাতাস আসবে, তত বেশি ঠান্ডা অনুভূত হবে। উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা কমে আসার পেছনেও এই বাতাসের প্রভাব রয়েছে।
নভেম্বরেই নামতে পারে তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রিতে
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বরের প্রথম দিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে। নভেম্বরের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে রাজধানী ঢাকায় শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে ডিসেম্বর থেকে। ওই সময় ঢাকার তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে। পাশাপাশি শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে এসব পূর্বাভাসের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাতাসের গতিপ্রকৃতি, রাতের তাপমাত্রা এবং সামগ্রিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর।
কেন এবারের শীত হবে উষ্ণ?
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবিরের মতে, এবারের শীত তুলনামূলক উষ্ণ হওয়ার পেছনে এল নিনোর প্রভাব ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে এবার শীতের তীব্রতা কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, এবারের শীতে শীতের অনুভূতি তুলনামূলক কম হতে পারে। একই সঙ্গে শীতকালের স্থায়িত্বও কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এবার শীতের স্থায়িত্ব ৯০ দিনের কম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ‘ওয়ার্ম উইন্টার’ মানেই যে শীত পড়বে না, বিষয়টি এমন নয়। বরং স্বাভাবিকের তুলনায় সামগ্রিক তাপমাত্রা বেশি থাকলেও কোনো কোনো সময়ে তীব্র শীত বা শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।
কমবে সূর্যের তাপ, বাড়বে শীতের অনুভূতি
বর্ষাকালে সূর্যের কিরণ তুলনামূলক খাড়াভাবে পড়লেও শীতের দিকে তা ক্রমশ তির্যক হয়ে আসে। ফলে ভূপৃষ্ঠে সূর্যের তাপের প্রভাব কমতে থাকে। এ কারণে দিনের তাপমাত্রা ও রাতের তাপমাত্রার অনুভূতিতে পরিবর্তন আসে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর দিক থেকে শীতল বাতাসের প্রবাহ এবং সূর্যের তাপের প্রভাব কমে আসার কারণে আগামী দিনগুলোতে শীতের অনুভূতি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
তবে দিনের বেলায় রোদের কারণে গরম অনুভূত হলেও সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকতে পারে। ফলে সকাল ও রাতের শীতলতা এবং দুপুরের উষ্ণতার মধ্যে পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
ভোরের কুয়াশা ঋতু পরিবর্তনের বার্তা
গ্রামাঞ্চলে ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও ভোরের দিকে হালকা কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। নদী, খাল, বিল, জলাশয় ও ফসলের মাঠের ওপর কুয়াশার পাতলা চাদর জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা।
রাতের তাপমাত্রা কমে গেলে এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি থাকলে ভোরের দিকে কুয়াশা তৈরি হয়। খোলা মাঠে তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ায় ঘাস ও গাছের পাতায় জমছে শিশির। সূর্য ওঠার পর তাপমাত্রা বাড়লে ধীরে ধীরে কুয়াশা কেটে যাচ্ছে।
তবে কুয়াশা দেখা দিলেই যে শীত জেঁকে বসেছে, তা নয়। এখনকার পরিস্থিতি মূলত বর্ষা থেকে শীতের দিকে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। শীতের তীব্রতা বাড়তে হলে রাত ও দিনের তাপমাত্রায় ধারাবাহিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
বৃষ্টির সম্ভাবনা কি বাড়বে?
মৌসুমি বায়ু বিদায় নিলেও দেশে বৃষ্টির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হলে কিংবা বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন ঘটলে দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলে আবহাওয়ার পরিবর্তন বেশি অনুভূত হতে পারে।
এবারের শীত উষ্ণ হলে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, শীতের সঙ্গে বৃষ্টির সরাসরি সম্পর্ক নেই। শীতকালে বাতাসের ধরনে পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি হতে পারে। ভূমধ্যসাগর থেকে আসা বাতাস দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে তা মেঘ নিয়ে আসতে পারে, যার ফলে বৃষ্টিপাতের সৃষ্টি হয়।
কৃষি ও জনজীবনে পড়বে প্রভাব
শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ জনজীবনেও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ভোরে কাজে বের হওয়া কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও পথচারীরা বাতাসে শীতলতা বেশি অনুভব করছেন।
কৃষিক্ষেত্রেও ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালীন সবজি চাষ, জমি প্রস্তুত এবং রবি ফসলের পরিকল্পনায় কৃষকেরা আবহাওয়ার পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। তবে কুয়াশার ঘনত্ব ও স্থায়িত্ব কিছু ফসলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আবহাওয়াবিদ মো. রোবাঈয়্যাৎ কবীর জানিয়েছেন, এ সময়ে দেশে দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা উজ্জ্বল সূর্যকিরণ থাকতে পারে। দৈনিক গড় বাষ্পীভবন হতে পারে ৩ থেকে ৫ মিলিমিটার। সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ২ ডিগ্রি কম বা বেশি হতে পারে। অন্যদিকে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি কম বা বেশি থাকতে পারে।
আপাতত অপেক্ষা শীতের পূর্ণ আগমনের
সব মিলিয়ে দেশে ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা কমছে, গ্রামাঞ্চলে দেখা মিলছে ভোরের কুয়াশা, আর রাতের বাতাসে অনুভূত হচ্ছে শীতলতা। তবে এখনই তীব্র শীতের পূর্বাভাস ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আবহাওয়াবিদদের ধারণা, নভেম্বর থেকে শীতের অনুভূতি বাড়তে শুরু করলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের প্রকৃত প্রভাব দেখা যেতে পারে ডিসেম্বর থেকে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বাতাসের গতিপ্রকৃতির কারণে এবারের শীত স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ হতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















