শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুলাউড়ায় ৮ হাজার পানগাছ কাটার অভিযোগ, ক্ষতি ৫০ লাখ টাকা

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের নার্সারি খাসিয়া পুঞ্জিতে রাতের আঁধারে ১০টি খাসিয়া ও গারো পরিবারের পানজুমের ৮ হাজারের বেশি পানগাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের। পান চাষের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো এখন জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ এবং আদিবাসী পান চাষিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, নাগরিক অধিকারকর্মী ও পরিবেশকর্মীরা।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১১টায় মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব চত্বরে এ কর্মসূচি পালিত হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখা, কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন, খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটি এবং ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) যৌথভাবে এর আয়োজন করে। পরে একটি প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান এবং পাঁচ দফা দাবিতে স্মারকলিপি দেন।

এক রাতেই বিপর্যস্ত ১০ পরিবার

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে দুর্বৃত্তরা নার্সারি পুঞ্জির পানজুমে ঢুকে পানগাছ কেটে ফেলে। এতে ১০টি পরিবারের পান চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, কেটে ফেলা গাছের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

পান চাষই পুঞ্জির এসব পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। দীর্ঘদিন পরিচর্যার পর একটি পানগাছ থেকে আয় করা সম্ভব হয়। গাছ কেটে ফেলায় পরিবারগুলো তাৎক্ষণিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আয়ের পথও হারিয়েছে।

কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, নার্সারি পুঞ্জির আগে সাহেব টিলা পুঞ্জিতেও পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক এমন ঘটনায় পান চাষের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এভাবে পানগাছ ধ্বংস হতে থাকলে পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন পুলিশের

গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুলাউড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান ক্ষতিগ্রস্ত পানজুম পরিদর্শন করেন। এ সময় কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না, উপপরিদর্শক (এসআই) অলক বিহারী গুন ও মো. ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন।

সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কাজ করছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

পাঁচ দফা দাবিতে স্মারকলিপি

মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় শুধু কয়েকটি পরিবারের সম্পদের ক্ষতি হয়নি, বরং তাদের দীর্ঘদিনের জীবিকা ও ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়েছে। তাই অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফ্লোরা বাবলি তালাংয়ের সভাপতিত্বে এবং মানবাধিকারকর্মী হেলেনা তালাংয়ের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) সিলেটের সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম, ভয়েস অব রিভার মনুর প্রধান নির্বাহী আসম ছালেহ সুহেল, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ডাডলি ডেরিক প্রেন্টিস ও সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল হাসানসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

বক্তারা পানগাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আদিবাসী পান চাষিদের জীবন-জীবিকা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

পুঞ্জিবাসী ও আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবিকা পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দীর্ঘদিনের শ্রমে গড়ে তোলা পানজুম হারিয়ে পরিবারগুলো এখন আর্থিক সংকটের মুখে। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বিচার, ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

মান্দায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে তিনজন গ্রেপ্তার, মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

কুলাউড়ায় ৮ হাজার পানগাছ কাটার অভিযোগ, ক্ষতি ৫০ লাখ টাকা

প্রকাশের সময় : ০৪:১০:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের নার্সারি খাসিয়া পুঞ্জিতে রাতের আঁধারে ১০টি খাসিয়া ও গারো পরিবারের পানজুমের ৮ হাজারের বেশি পানগাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের। পান চাষের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো এখন জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ এবং আদিবাসী পান চাষিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, নাগরিক অধিকারকর্মী ও পরিবেশকর্মীরা।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১১টায় মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব চত্বরে এ কর্মসূচি পালিত হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখা, কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন, খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটি এবং ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) যৌথভাবে এর আয়োজন করে। পরে একটি প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান এবং পাঁচ দফা দাবিতে স্মারকলিপি দেন।

এক রাতেই বিপর্যস্ত ১০ পরিবার

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে দুর্বৃত্তরা নার্সারি পুঞ্জির পানজুমে ঢুকে পানগাছ কেটে ফেলে। এতে ১০টি পরিবারের পান চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, কেটে ফেলা গাছের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

পান চাষই পুঞ্জির এসব পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। দীর্ঘদিন পরিচর্যার পর একটি পানগাছ থেকে আয় করা সম্ভব হয়। গাছ কেটে ফেলায় পরিবারগুলো তাৎক্ষণিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আয়ের পথও হারিয়েছে।

কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, নার্সারি পুঞ্জির আগে সাহেব টিলা পুঞ্জিতেও পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক এমন ঘটনায় পান চাষের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এভাবে পানগাছ ধ্বংস হতে থাকলে পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন পুলিশের

গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুলাউড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান ক্ষতিগ্রস্ত পানজুম পরিদর্শন করেন। এ সময় কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না, উপপরিদর্শক (এসআই) অলক বিহারী গুন ও মো. ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন।

সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কাজ করছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

পাঁচ দফা দাবিতে স্মারকলিপি

মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় শুধু কয়েকটি পরিবারের সম্পদের ক্ষতি হয়নি, বরং তাদের দীর্ঘদিনের জীবিকা ও ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়েছে। তাই অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফ্লোরা বাবলি তালাংয়ের সভাপতিত্বে এবং মানবাধিকারকর্মী হেলেনা তালাংয়ের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) সিলেটের সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম, ভয়েস অব রিভার মনুর প্রধান নির্বাহী আসম ছালেহ সুহেল, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ডাডলি ডেরিক প্রেন্টিস ও সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল হাসানসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

বক্তারা পানগাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আদিবাসী পান চাষিদের জীবন-জীবিকা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

পুঞ্জিবাসী ও আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবিকা পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দীর্ঘদিনের শ্রমে গড়ে তোলা পানজুম হারিয়ে পরিবারগুলো এখন আর্থিক সংকটের মুখে। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বিচার, ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।