বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিনা সুদে ঋণ ও প্রশিক্ষণের অভাবে বাড়ছে না নারী উদ্যোক্তা | বছরে কোটি চারা উৎপাদন, বিক্রি প্রায় ১০ কোটি টাকার

ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকে এলাকা, ভাসমান বেডে স্বপ্ন বুনছেন পিরোজপুরের নারীরা

বছরের ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি-দোবরা ও নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। বর্ষায় চারদিকে থইথই পানি, অথচ সেই পানিকেই কাজে লাগিয়ে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদন করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। পুরুষদের পাশাপাশি এ কাজে যুক্ত হয়েছেন নারীরাও। অভাব-অনটন পেরিয়ে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন এখন তাঁদের জীবিকার উৎস, স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন। তবে পর্যাপ্ত পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা তাঁদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছেন না।

নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে নারী উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন এলাকার প্রায় ১০ জন নারী। কেউ দুলালী লতা দিয়ে তৈরি ম্যাদায় সবজির বীজ বুনছেন, কেউ আবার অঙ্কুরিত চারা পরিচর্যা করছেন। এভাবেই পানির ওপর গড়ে ওঠা ভাসমান বেডে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।

নুরজাহানের স্বপ্ন শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন নয়, এলাকার অসহায় ও কর্মহীন নারীদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে সেই স্বপ্নের পরিধি বাড়াতে পারছেন না তিনি।

পানির ওপর ভাসমান বেডে জীবিকার সন্ধান

স্থানীয়ভাবে দুলালী লতা দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের ম্যাদার ভেতরে বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা হয়। এ কাজে যুক্ত নারীরা প্রতিদিন চারা উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ করেন। তাঁদের কেউ বীজ বপন করেন, কেউ চারা সাজানো ও পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করেন।

কাজের পরিমাণ অনুযায়ী প্রতিদিন একজন নারী প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার চারার প্রাথমিক কাজ করতে পারেন। প্রতি এক হাজার ম্যাদা তৈরি করে তাঁরা মজুরি পান ১৫০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই চলে তাঁদের সংসার। তবে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত আয় না হওয়ায় অনেকের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।

নেছারাবাদের বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, “সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমরা কাজ করি। সারাদিন এত পরিশ্রম করি, তারপরও ২০০ টাকা ইনকাম করতে অনেক কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নাই যে আমরা করব। তাই এগুলোই করি। আমাদের যদি ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হইত, তাহলে ভালো হইত। এক হাজার ম্যাদা বানাইয়া দেড়শ টাকা পাই। তাতে কি আর সংসার চলে!”

রহিমার মতো অনেক নারীই এ কাজের মাধ্যমে নিজেদের ও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে চান। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে চারা উৎপাদনের পাশাপাশি নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারবেন।

কর্মসংস্থান বাড়াতে চান নুরজাহান

দীর্ঘদিন ধরে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নুরজাহান বেগম এখন নিজের উদ্যোগকে আরও বড় করতে চান। তাঁর লক্ষ্য, এলাকার কর্মহীন নারীদের কাজে যুক্ত করে তাঁদের আয়ের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় চাইলেও বেশি নারীকে কাজ দিতে পারছেন না।

নুরজাহান বেগম বলেন, “আমি একজন নারী উদ্যোক্তা। আমি এই কাজ ২০০৫ সাল থেকে করে আসছি। অনেক পরিবার আছে, তারা দুঃখে-কষ্টে ভোগে। আমি যে তাদের সামনে আগাইয়া নিমু, তা তো আমি পারতাছি না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে আগাইতে পারতাম। নারীদের কাজ করাইতে পারতাম। নারীরা ছেলে-মেয়ে মানুষ করতে পারতো। আমরা চাই, আমরা যেন সামনে আগাইতে পারি। যে নারীরা ঘরে বসা আছে, কোনো কাজ করতে পারতেছে না, আমি তাদের নিয়ে কাজ করতে চাই। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।”

নুরজাহানের মতো সম্ভাবনাময় নারী উদ্যোক্তাদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে এখানকার চারা

নাজিরপুর ও নেছারাবাদের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে ভাসমান বেডে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিম, পেঁপে, করলা, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।

ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকারী কৃষক লুৎফুর রহমান বলেন, “এখানে সকাল ছয়টায় আসি কাজ করতে। বেডে চারা রোপণ করি, ওষুধ দিই, লতা পরিষ্কার করি। এই জায়গার চারা ঢাকা, খুলনা, গোপালগঞ্জ ও বরিশালসহ অনেক জায়গায় যায়। প্রতি বছর এখানে লাখ লাখ চারা উৎপাদন হয়। এই জায়গায় পেঁপে, লাউ, করলা, বেগুন, মরিচ, মিষ্টিকুমড়া—এসব চারা উৎপাদন হয়। বিভিন্ন রকমের সবজির চারা প্রতি পিস তিন থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।”

পিরোজপুর পৌর শহরে সবজির চারা খুচরা বিক্রি করেন রফিক শেখ। তিনি বলেন, “নাজিরপুরের ভাসমান বেডের চারা এনে এখানে বিক্রি করি। আমরা বিভিন্ন জাতের সবজির চারা ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বিক্রি করি। ভাসমান বেড দিয়া ৫ থেকে ৭ টাকা করে প্রতি পিস কিনে আনি।”

স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হওয়ায় এ কৃষিপদ্ধতির অর্থনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রির কাজে যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন অনেকে।

বছরে উৎপাদন কোটি চারা, বিক্রি প্রায় ১০ কোটি টাকার

স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নাজিরপুরের দেউলবাড়ি, দোবরা ও নেছারাবাদের বলদিয়া ইউনিয়নের পাঁচটি ব্লকে ভাসমান বেড ও ধাপ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। প্রায় ২২৫ হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতিতে সবজির চারা উৎপাদন চলছে।

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ কৃষিপদ্ধতিতে কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এর আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রতি মৌসুমে প্রায় এক কোটি বিভিন্ন প্রজাতির সবজির চারা উৎপাদন হয়। এসব চারা বিক্রি করে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, “নাজিরপুর এবং নেছারাবাদে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন হয়। উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। এই পেশায় প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। তাঁদের কৃষি অফিস থেকে সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

সরকারি সহায়তা পেলে বাড়তে পারে নারীদের কর্মসংস্থান

প্রাকৃতিক জলাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদন এখন এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় অভাব-অনটনে থাকা অনেক পরিবারের জীবনে এ পদ্ধতি পরিবর্তন এনেছে। উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আয় করছেন কৃষক ও শ্রমিকেরা। এর মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথও তৈরি করছে।

তবে শ্রমের তুলনায় কম আয়, প্রশিক্ষণের অভাব এবং প্রয়োজনীয় পুঁজি না থাকায় অনেক নারী এখনো নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারছেন না। তাঁদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বিনা সুদে অর্থায়ন, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে নুরজাহান বেগমের মতো উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে কর্মহীন নারীদের কাজে যুক্ত করার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। এতে নারীদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ার পাশাপাশি পিরোজপুরের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিও আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পানিবেষ্টিত জনপদে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের এই উদ্যোগ শুধু কৃষিকাজ নয়, অনেক পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। যথাযথ পরিকল্পনা ও সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা সম্ভব।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকে এলাকা, ভাসমান বেডে স্বপ্ন বুনছেন পিরোজপুরের নারীরা

বিনা সুদে ঋণ ও প্রশিক্ষণের অভাবে বাড়ছে না নারী উদ্যোক্তা | বছরে কোটি চারা উৎপাদন, বিক্রি প্রায় ১০ কোটি টাকার

ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকে এলাকা, ভাসমান বেডে স্বপ্ন বুনছেন পিরোজপুরের নারীরা

প্রকাশের সময় : ০৬:৪৯:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বছরের ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি-দোবরা ও নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। বর্ষায় চারদিকে থইথই পানি, অথচ সেই পানিকেই কাজে লাগিয়ে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদন করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। পুরুষদের পাশাপাশি এ কাজে যুক্ত হয়েছেন নারীরাও। অভাব-অনটন পেরিয়ে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন এখন তাঁদের জীবিকার উৎস, স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন। তবে পর্যাপ্ত পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা তাঁদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছেন না।

নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে নারী উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন এলাকার প্রায় ১০ জন নারী। কেউ দুলালী লতা দিয়ে তৈরি ম্যাদায় সবজির বীজ বুনছেন, কেউ আবার অঙ্কুরিত চারা পরিচর্যা করছেন। এভাবেই পানির ওপর গড়ে ওঠা ভাসমান বেডে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।

নুরজাহানের স্বপ্ন শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন নয়, এলাকার অসহায় ও কর্মহীন নারীদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে সেই স্বপ্নের পরিধি বাড়াতে পারছেন না তিনি।

পানির ওপর ভাসমান বেডে জীবিকার সন্ধান

স্থানীয়ভাবে দুলালী লতা দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের ম্যাদার ভেতরে বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা হয়। এ কাজে যুক্ত নারীরা প্রতিদিন চারা উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ করেন। তাঁদের কেউ বীজ বপন করেন, কেউ চারা সাজানো ও পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করেন।

কাজের পরিমাণ অনুযায়ী প্রতিদিন একজন নারী প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার চারার প্রাথমিক কাজ করতে পারেন। প্রতি এক হাজার ম্যাদা তৈরি করে তাঁরা মজুরি পান ১৫০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই চলে তাঁদের সংসার। তবে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত আয় না হওয়ায় অনেকের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।

নেছারাবাদের বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, “সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমরা কাজ করি। সারাদিন এত পরিশ্রম করি, তারপরও ২০০ টাকা ইনকাম করতে অনেক কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নাই যে আমরা করব। তাই এগুলোই করি। আমাদের যদি ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হইত, তাহলে ভালো হইত। এক হাজার ম্যাদা বানাইয়া দেড়শ টাকা পাই। তাতে কি আর সংসার চলে!”

রহিমার মতো অনেক নারীই এ কাজের মাধ্যমে নিজেদের ও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে চান। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে চারা উৎপাদনের পাশাপাশি নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারবেন।

কর্মসংস্থান বাড়াতে চান নুরজাহান

দীর্ঘদিন ধরে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নুরজাহান বেগম এখন নিজের উদ্যোগকে আরও বড় করতে চান। তাঁর লক্ষ্য, এলাকার কর্মহীন নারীদের কাজে যুক্ত করে তাঁদের আয়ের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় চাইলেও বেশি নারীকে কাজ দিতে পারছেন না।

নুরজাহান বেগম বলেন, “আমি একজন নারী উদ্যোক্তা। আমি এই কাজ ২০০৫ সাল থেকে করে আসছি। অনেক পরিবার আছে, তারা দুঃখে-কষ্টে ভোগে। আমি যে তাদের সামনে আগাইয়া নিমু, তা তো আমি পারতাছি না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে আগাইতে পারতাম। নারীদের কাজ করাইতে পারতাম। নারীরা ছেলে-মেয়ে মানুষ করতে পারতো। আমরা চাই, আমরা যেন সামনে আগাইতে পারি। যে নারীরা ঘরে বসা আছে, কোনো কাজ করতে পারতেছে না, আমি তাদের নিয়ে কাজ করতে চাই। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।”

নুরজাহানের মতো সম্ভাবনাময় নারী উদ্যোক্তাদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে এখানকার চারা

নাজিরপুর ও নেছারাবাদের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে ভাসমান বেডে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিম, পেঁপে, করলা, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।

ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকারী কৃষক লুৎফুর রহমান বলেন, “এখানে সকাল ছয়টায় আসি কাজ করতে। বেডে চারা রোপণ করি, ওষুধ দিই, লতা পরিষ্কার করি। এই জায়গার চারা ঢাকা, খুলনা, গোপালগঞ্জ ও বরিশালসহ অনেক জায়গায় যায়। প্রতি বছর এখানে লাখ লাখ চারা উৎপাদন হয়। এই জায়গায় পেঁপে, লাউ, করলা, বেগুন, মরিচ, মিষ্টিকুমড়া—এসব চারা উৎপাদন হয়। বিভিন্ন রকমের সবজির চারা প্রতি পিস তিন থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।”

পিরোজপুর পৌর শহরে সবজির চারা খুচরা বিক্রি করেন রফিক শেখ। তিনি বলেন, “নাজিরপুরের ভাসমান বেডের চারা এনে এখানে বিক্রি করি। আমরা বিভিন্ন জাতের সবজির চারা ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বিক্রি করি। ভাসমান বেড দিয়া ৫ থেকে ৭ টাকা করে প্রতি পিস কিনে আনি।”

স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হওয়ায় এ কৃষিপদ্ধতির অর্থনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রির কাজে যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন অনেকে।

বছরে উৎপাদন কোটি চারা, বিক্রি প্রায় ১০ কোটি টাকার

স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নাজিরপুরের দেউলবাড়ি, দোবরা ও নেছারাবাদের বলদিয়া ইউনিয়নের পাঁচটি ব্লকে ভাসমান বেড ও ধাপ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। প্রায় ২২৫ হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতিতে সবজির চারা উৎপাদন চলছে।

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ কৃষিপদ্ধতিতে কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এর আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রতি মৌসুমে প্রায় এক কোটি বিভিন্ন প্রজাতির সবজির চারা উৎপাদন হয়। এসব চারা বিক্রি করে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, “নাজিরপুর এবং নেছারাবাদে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন হয়। উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। এই পেশায় প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। তাঁদের কৃষি অফিস থেকে সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

সরকারি সহায়তা পেলে বাড়তে পারে নারীদের কর্মসংস্থান

প্রাকৃতিক জলাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদন এখন এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় অভাব-অনটনে থাকা অনেক পরিবারের জীবনে এ পদ্ধতি পরিবর্তন এনেছে। উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আয় করছেন কৃষক ও শ্রমিকেরা। এর মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথও তৈরি করছে।

তবে শ্রমের তুলনায় কম আয়, প্রশিক্ষণের অভাব এবং প্রয়োজনীয় পুঁজি না থাকায় অনেক নারী এখনো নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারছেন না। তাঁদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বিনা সুদে অর্থায়ন, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে নুরজাহান বেগমের মতো উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে কর্মহীন নারীদের কাজে যুক্ত করার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। এতে নারীদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ার পাশাপাশি পিরোজপুরের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিও আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পানিবেষ্টিত জনপদে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের এই উদ্যোগ শুধু কৃষিকাজ নয়, অনেক পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। যথাযথ পরিকল্পনা ও সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা সম্ভব।