শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আড়াই মাসের অপেক্ষার অবসান, দেশে ফিরছে রিয়াদে নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ০৫:০৩:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৮ বার পড়া হয়েছে

অবশেষে শেষ হতে যাচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার প্রহর। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর বাকি পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ আগামীকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রায় আড়াই মাস পর প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার খবরে স্বজনদের মধ্যে একদিকে যেমন স্বস্তি ফিরেছে, অন্যদিকে শোকের ছায়া আরও গভীর হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ঋণের বোঝা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়া পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে শনিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

দেশে ফিরতে যাওয়া পাঁচ প্রবাসী হলেন নওগাঁ পৌর এলাকার পার নওগাঁর শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রবাসী প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হয়। তবে আইনি প্রক্রিয়া ও পরিচয় শনাক্তকরণে জটিলতার কারণে বাকি পাঁচজনের মরদেহ এতদিন সৌদি আরবের হিমঘরে রাখা হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন স্বজনেরা। আত্রাই উপজেলার মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদারের মরদেহের অপেক্ষায় ছিলেন তাঁর সত্তরোর্ধ্ব বাবা মজনু সরদার ও মা ছাইদা বেগম। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খোঁজ নিতে প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। ছেলের মুখটি শেষবারের মতো দেখার আকুতি ছিল তাঁদের চোখেমুখে।

অন্যদিকে, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিকের মা পারুল আক্তার ছেলের ছবি মুঠোফোনে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তান হারানোর শোক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মরদেহ দেশে আসার খবরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একদিকে শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখার অপেক্ষা, অন্যদিকে চিরবিদায়ের বেদনা।

শোকের পাশাপাশি নিহতদের পরিবারগুলো এখন পড়েছে চরম আর্থিক সংকটে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কেউ ভিটেমাটি বন্ধক রেখে, আবার কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে তাঁদের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলেও পরিবারের ঘাড়ে রয়ে গেছে ঋণের বিশাল বোঝা।

আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। একমাত্র সম্বল ভিটেবাড়িটিও মহাজনের কাছে বন্ধক রাখা রয়েছে। এরই মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। দুই সন্তানকে নিয়ে পাওনাদারদের তাগাদায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে মরদেহগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পাশাপাশি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

এমপি আব্দুল আজিজের আপত্তিকর ভিডিও ছড়ানোর ঘটনায় তদন্তে নামছে নাটোর জেলা বিএনপি

আড়াই মাসের অপেক্ষার অবসান, দেশে ফিরছে রিয়াদে নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ

প্রকাশের সময় : ০৫:০৩:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

অবশেষে শেষ হতে যাচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার প্রহর। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর বাকি পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ আগামীকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রায় আড়াই মাস পর প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার খবরে স্বজনদের মধ্যে একদিকে যেমন স্বস্তি ফিরেছে, অন্যদিকে শোকের ছায়া আরও গভীর হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ঋণের বোঝা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়া পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে শনিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

দেশে ফিরতে যাওয়া পাঁচ প্রবাসী হলেন নওগাঁ পৌর এলাকার পার নওগাঁর শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রবাসী প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হয়। তবে আইনি প্রক্রিয়া ও পরিচয় শনাক্তকরণে জটিলতার কারণে বাকি পাঁচজনের মরদেহ এতদিন সৌদি আরবের হিমঘরে রাখা হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন স্বজনেরা। আত্রাই উপজেলার মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদারের মরদেহের অপেক্ষায় ছিলেন তাঁর সত্তরোর্ধ্ব বাবা মজনু সরদার ও মা ছাইদা বেগম। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খোঁজ নিতে প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। ছেলের মুখটি শেষবারের মতো দেখার আকুতি ছিল তাঁদের চোখেমুখে।

অন্যদিকে, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিকের মা পারুল আক্তার ছেলের ছবি মুঠোফোনে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তান হারানোর শোক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মরদেহ দেশে আসার খবরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একদিকে শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখার অপেক্ষা, অন্যদিকে চিরবিদায়ের বেদনা।

শোকের পাশাপাশি নিহতদের পরিবারগুলো এখন পড়েছে চরম আর্থিক সংকটে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কেউ ভিটেমাটি বন্ধক রেখে, আবার কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে তাঁদের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলেও পরিবারের ঘাড়ে রয়ে গেছে ঋণের বিশাল বোঝা।

আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। একমাত্র সম্বল ভিটেবাড়িটিও মহাজনের কাছে বন্ধক রাখা রয়েছে। এরই মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। দুই সন্তানকে নিয়ে পাওনাদারদের তাগাদায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে মরদেহগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পাশাপাশি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।