রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬,
২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আগাম সবজি চাষে রেকর্ড সিরাজগঞ্জে, ভালো দামে খুশি কৃষক

শীতের আগমন এখনো দেড় মাস বাকি। তবে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন সিরাজগঞ্জের কৃষকেরা। জেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে চলছে মুলা, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, বেগুন ও টমেটোসহ নানা জাতের সবজির আবাদ। এরই মধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে আগাম শীতকালীন সবজি। মৌসুমের আগেই বাজারে সবজি তুলতে পারায় অন্যান্য বছরের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকেরা। এতে সবজি চাষে আগ্রহও বাড়ছে তাদের।

তবে বাজারে সবজির ভালো দাম পেলেও উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে সার, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের বাড়তি দামে বেড়েছে চাষাবাদের ব্যয়। ফলে ভালো ফলন ও বাজারদর সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তাদের মধ্যে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৯১১ হেক্টর জমিতে আগাম সবজি চাষ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে আরও ৬ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি চলছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে রায়গঞ্জ উপজেলায়। এ উপজেলায় ৬৮৫ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া কাজীপুরে ৬৭০ হেক্টর, উল্লাপাড়ায় ৪৭৫ হেক্টর, কামারখন্দে ৩০৫ হেক্টর, শাহজাদপুরে ২৯৫ হেক্টর, সিরাজগঞ্জ সদরে ১৭০ হেক্টর, তাড়াশে ১৭০ হেক্টর, বেলকুচিতে ১৩০ হেক্টর এবং চৌহালীতে ১১ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে।

কৃষি বিভাগ আরও জানায়, গত বছর একই সময়ে জেলায় ২ হাজার ১৮৬ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯১১ হেক্টরে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার ৭২৫ হেক্টর বেশি জমিতে আগাম সবজির আবাদ হয়েছে।

সরেজমিনে সিরাজগঞ্জ সদর, রায়গঞ্জ ও কাজীপুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, সবুজে ছেয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। কোথাও ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা, কোথাও শিম ও মুলার আবাদ। আবার কোথাও গাজরসহ নানা ধরনের শীতকালীন সবজির পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষকেরা। ভোর থেকে শুরু করে দিনভর চলছে জমিতে নিড়ানি দেওয়া, সেচ, সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ছিটানোর কাজ। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে খেত থেকে সবজি তুলে বাজারজাত করছেন। পাশাপাশি নতুন করে চারা রোপণেও ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

রায়গঞ্জ উপজেলার বিলচণ্ডী গ্রামের কৃষক সাইদুল ইসলাম জানান, এবার ৩৫ শতক জমিতে ফুলকপি ও বাঁধাকপির আবাদ করেছেন তিনি। শীত পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই এসব সবজি বাজারে বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, এক বিঘা জমিতে ফুলকপি ও মুলা চাষ করেছেন তিনি। কার্তিক মাসের শুরু থেকেই নিয়মিত বাজারে সবজি বিক্রি করছেন। বর্তমানে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট।

কাজীপুর উপজেলার কৃষক জুড়ান আলী বলেন, বাজারে আগাম সবজির চাহিদা থাকায় এবার খেত থেকেই মুলা ও ফুলকপি বিক্রি শুরু করেছেন। তবে সার কিনতে অতিরিক্ত টাকা খরচ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী এলাকার কৃষক জহুরুল ইসলাম বলেন, এবার আগাম সবজির ফলন বেশ ভালো হচ্ছে। বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সার, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন।

রায়গঞ্জ উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, এ উপজেলায় এখন পর্যন্ত ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে। কৃষকেরা এখন মাঠে ব্যাপক ব্যস্ত সময় পার করছেন। কে কত ভালো ফলন ফলাতে পারেন, তা নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া এখন পর্যন্ত সবজি চাষের অনুকূলে রয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ হাজার ৯১১ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে। নতুন করে আরও ৬ হাজার হেক্টর জমিতে চাষের প্রক্রিয়া চলছে। আগাম সবজি বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়ায় গত বছরের তুলনায় কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম মনজুরে মাওলা বলেন, সিরাজগঞ্জের মাটি ও উঁচু জমি সবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ অঞ্চলে সবজি উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকেরা যাতে ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্য পান, সে লক্ষ্যে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে শীত আসার আগেই আগাম সবজির আবাদ ও বাজারজাতকরণে সরগরম হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের কৃষিপাড়া। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো বাজারদর অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে সবজি চাষে কৃষকেরা আশানুরূপ লাভবান হবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

সমবায়ের চেতনায় এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে আত্রাইয়ে জাতীয় সমবায় দিবস পালিত

আগাম সবজি চাষে রেকর্ড সিরাজগঞ্জে, ভালো দামে খুশি কৃষক

প্রকাশের সময় : ০৮:৫৮:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

শীতের আগমন এখনো দেড় মাস বাকি। তবে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন সিরাজগঞ্জের কৃষকেরা। জেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে চলছে মুলা, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, বেগুন ও টমেটোসহ নানা জাতের সবজির আবাদ। এরই মধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে আগাম শীতকালীন সবজি। মৌসুমের আগেই বাজারে সবজি তুলতে পারায় অন্যান্য বছরের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকেরা। এতে সবজি চাষে আগ্রহও বাড়ছে তাদের।

তবে বাজারে সবজির ভালো দাম পেলেও উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে সার, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের বাড়তি দামে বেড়েছে চাষাবাদের ব্যয়। ফলে ভালো ফলন ও বাজারদর সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তাদের মধ্যে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৯১১ হেক্টর জমিতে আগাম সবজি চাষ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে আরও ৬ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি চলছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে রায়গঞ্জ উপজেলায়। এ উপজেলায় ৬৮৫ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া কাজীপুরে ৬৭০ হেক্টর, উল্লাপাড়ায় ৪৭৫ হেক্টর, কামারখন্দে ৩০৫ হেক্টর, শাহজাদপুরে ২৯৫ হেক্টর, সিরাজগঞ্জ সদরে ১৭০ হেক্টর, তাড়াশে ১৭০ হেক্টর, বেলকুচিতে ১৩০ হেক্টর এবং চৌহালীতে ১১ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে।

কৃষি বিভাগ আরও জানায়, গত বছর একই সময়ে জেলায় ২ হাজার ১৮৬ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯১১ হেক্টরে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার ৭২৫ হেক্টর বেশি জমিতে আগাম সবজির আবাদ হয়েছে।

সরেজমিনে সিরাজগঞ্জ সদর, রায়গঞ্জ ও কাজীপুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, সবুজে ছেয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। কোথাও ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা, কোথাও শিম ও মুলার আবাদ। আবার কোথাও গাজরসহ নানা ধরনের শীতকালীন সবজির পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষকেরা। ভোর থেকে শুরু করে দিনভর চলছে জমিতে নিড়ানি দেওয়া, সেচ, সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ছিটানোর কাজ। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে খেত থেকে সবজি তুলে বাজারজাত করছেন। পাশাপাশি নতুন করে চারা রোপণেও ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

রায়গঞ্জ উপজেলার বিলচণ্ডী গ্রামের কৃষক সাইদুল ইসলাম জানান, এবার ৩৫ শতক জমিতে ফুলকপি ও বাঁধাকপির আবাদ করেছেন তিনি। শীত পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই এসব সবজি বাজারে বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, এক বিঘা জমিতে ফুলকপি ও মুলা চাষ করেছেন তিনি। কার্তিক মাসের শুরু থেকেই নিয়মিত বাজারে সবজি বিক্রি করছেন। বর্তমানে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট।

কাজীপুর উপজেলার কৃষক জুড়ান আলী বলেন, বাজারে আগাম সবজির চাহিদা থাকায় এবার খেত থেকেই মুলা ও ফুলকপি বিক্রি শুরু করেছেন। তবে সার কিনতে অতিরিক্ত টাকা খরচ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী এলাকার কৃষক জহুরুল ইসলাম বলেন, এবার আগাম সবজির ফলন বেশ ভালো হচ্ছে। বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সার, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন।

রায়গঞ্জ উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, এ উপজেলায় এখন পর্যন্ত ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে। কৃষকেরা এখন মাঠে ব্যাপক ব্যস্ত সময় পার করছেন। কে কত ভালো ফলন ফলাতে পারেন, তা নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া এখন পর্যন্ত সবজি চাষের অনুকূলে রয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ হাজার ৯১১ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে। নতুন করে আরও ৬ হাজার হেক্টর জমিতে চাষের প্রক্রিয়া চলছে। আগাম সবজি বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়ায় গত বছরের তুলনায় কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম মনজুরে মাওলা বলেন, সিরাজগঞ্জের মাটি ও উঁচু জমি সবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ অঞ্চলে সবজি উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকেরা যাতে ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্য পান, সে লক্ষ্যে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে শীত আসার আগেই আগাম সবজির আবাদ ও বাজারজাতকরণে সরগরম হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের কৃষিপাড়া। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো বাজারদর অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে সবজি চাষে কৃষকেরা আশানুরূপ লাভবান হবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।