
শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাস। তবে নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে রাজশাহীর বাগমারা ও নওগাঁর আত্রাইয়ের পৃথক দুটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন।
রোববার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ পৌরসভার ‘আত-তাবারা মডেল হাসপাতালে’ অভিযান চালিয়ে এই ভুয়া চিকিৎসককে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাগমারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ভূঁঞা এই আদেশ দেন।
অপরদিকে আত্রাই সেভেন স্টারস্ হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিতরণকৃত একটি লিফলেট থেকে জানা যায়, সেখানে নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডা. মোঃ রফিকুল হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। লিফলেট অনুযায়ী তিনি এমবিবিএস, এমসিপিএস (মেডিসিন), এফসিপিএস (নিউরো মেডিসিন) ডিগ্রিধারী এবং কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত) হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। লিফলেটে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তিনি রোগী দেখেন। তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, লিফলেটে উল্লেখিত এসব পদবি ও যোগ্যতার বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, উল্লিখিত ডিগ্রি ও পেশাগত পরিচয়ের সত্যতা এখনো যাচাই হয়নি এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জানা গেছে, আটক নুরুল ইসলাম রাজশাহী নগরীর বহরমপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি নিজেকে ‘ডা. মো. রফিকুল হাসান’ পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন। বিএমডিসি ( BMDC) নিবন্ধন নম্বর A-34797 ব্যবহার করে তিনি নিজেকে নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দাবি করতেন, যা ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) নিবন্ধন নম্বর A-34797 ব্যবহার করে নিজেকে নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দেন নুরুল ইসলাম। তার প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাস বলে জানা যায়। তবে হাসপাতালের সাইনবোর্ড ও চেম্বারে তার নামের পাশে এমবিবিএস, এমসিপিএস (মেডিসিন) এবং এফসিপিএস (নিউরো মেডিসিন)-এর মতো উচ্চতর সব ডিগ্রির কথা উল্লেখ ছিল।
অভিযানের সময় বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. সাফিউল্লাহ নেওয়াজ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ভূঁঞার কাছে প্রসিকিউশন দাখিল করেন। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর ২৮(৩) ধারা অনুযায়ী অভিযুক্তকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন।
এ ছাড়া, আত-তাবারা মডেল হাসপাতালের মালিক মশিউর রহমানকে জেনে-শুনে ভুয়া চিকিৎসক নিয়োগ এবং রোগীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলার দায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫২ ধারা অনুযায়ী ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরুল ইসলাম শুধু ভবানীগঞ্জেই নয়, নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সেভেন স্টার ক্লিনিকসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখতেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট ও ভুয়া চিকিৎসকদের মাধ্যমে ভুল চিকিৎসার কারণে ইতিপূর্বে রোগী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তবে এতদিন এসব বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও এ এস এম সায়েমসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আত্রাই সেভেন স্টারস্ হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক এহসানুল হক অন্তর বলেন, “একদিন তিনি আমাদের হাসপাতালে এসে চেম্বার করার প্রস্তাব দেন। এরপর কিছুদিন তিনি এখানে রোগী দেখেছেন। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ডা. রফিকুল হাসান আর আমাদের হাসপাতালে বসছেন না।”
এদিকে আত্রাই উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ খায়রুল আলমের কাছে থেকে ভুয়া চিকিৎসক আত্রাই সেভেন স্টার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেবা প্রদান করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, কোন প্রতিষ্ঠানে ভুয়া চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারেন না। আমি এই বিষয়টা জেনেছি। এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলবো।
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলাম ভূঁঞা বলেন, জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। ভুয়া চিকিৎসককে জেল ও জরিমানা করা হয়েছে। একইসঙ্গে হাসপাতালের মালিককেও বড় অংকের জরিমানা করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









