রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১২ বছর ধরে গাছের সঙ্গে শিকলে বাঁধা বকুল, টাকার অভাবে মিলছে না চিকিৎসা

আত্রাইয়ে হতদরিদ্র পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন, সন্তানের মুক্ত জীবনের আকুতি মায়ের

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ০৮:৩৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

নওগাঁর আত্রাইয়ে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে ১২ বছর ধরে মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে বকুল শাখিদারকে (১৮) গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হচ্ছে একটি হতদরিদ্র পরিবারকে। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে গাছের নিচে শিকলবন্দি অবস্থায় কাটছে বকুলের জীবন। সন্তানের এমন মানবেতর জীবন দেখে অসহায় মা-বাবার চোখে এখন শুধু কান্না।

বকুল শাখিদার উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের বামনি গ্রামের দিনমজুর আতিকুল শাখিদারের ছেলে।

বকুলের মা ববিতা বিবি জানান, বকুল তার প্রথম সন্তান। জন্মের সময় প্রসব জটিলতা দেখা দিলে নৌকাযোগে আত্রাই হাসপাতালে নেওয়ার পথে নৌকাতেই তার জন্ম হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বকুলের চলাফেরা ও আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

পরে রাজশাহীর এক শিশু চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, প্রসবের সময় শিশুটির মাথায় অতিরিক্ত চাপ পড়ায় এমন সমস্যা হয়েছে। নিয়মিত প্রায় ছয় বছর চিকিৎসা করালে সে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে বলেও চিকিৎসক জানিয়েছিলেন।

বকুলের পরিবার জানায়, ছেলের চিকিৎসার জন্য ধারদেনা ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় তিন বছর চিকিৎসা চালানো হয়। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে একপর্যায়ে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বকুলের আচরণ আরও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুরসহ বিভিন্ন সময় মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করত সে। এমনকি অনেক সময় স্থানীয়দের মারধরের শিকারও হতে হয়েছে তাকে।

পরিবারের ভাষ্য, পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়েই প্রায় ১২ বছর ধরে বাড়ির পাশের সড়কের ধারে একটি আমগাছের সঙ্গে লোহার শিকল দিয়ে বকুলকে বেঁধে রাখা হচ্ছে। সেখানেই তাকে সকাল ও দুপুরের খাবার দেওয়া হয়।

বকুলের মা ববিতা বিবি বলেন, রোদ-বৃষ্টি, শীত সবকিছুই আমার সন্তানের মাথার ওপর দিয়ে যায়। ঘরের ভেতর থেকে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার কিছুই করার নেই। বুকের ভেতর কষ্ট নিয়ে প্রতিদিন চোখের পানি ফেলি।

তিনি আরও বলেন, রাতে বকুলকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। সকালে তার ঘুম ভাঙার আগেই পায়ে শিকল পরিয়ে দিতে হয়। শিকল খুলে দিলে সে দৌড়ে চলে যায়।

বকুলের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তাদের বসতভিটা মাত্র আড়াই শতক। বকুলের বাবা অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে যে আয় করেন, তা দিয়ে কোনোমতে তিন সন্তানসহ পরিবারের সংসার চলে। ফলে বকুলের চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

ববিতা বিবি বলেন, চিকিৎসক বলেছেন, এখনো যদি সঠিকভাবে চিকিৎসা করানো যায়, তাহলে আমার ছেলে ভালো হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই। আমি চাই, আমার সন্তানটি যেন শিকলমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায়।

এ অবস্থায় বকুলের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রশাসন ও সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তার মা।

এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আবেদন পেলে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা করা হবে।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

আত্রাইয়ে হতদরিদ্র পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন, সন্তানের মুক্ত জীবনের আকুতি মায়ের

১২ বছর ধরে গাছের সঙ্গে শিকলে বাঁধা বকুল, টাকার অভাবে মিলছে না চিকিৎসা

আত্রাইয়ে হতদরিদ্র পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন, সন্তানের মুক্ত জীবনের আকুতি মায়ের

প্রকাশের সময় : ০৮:৩৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নওগাঁর আত্রাইয়ে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে ১২ বছর ধরে মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে বকুল শাখিদারকে (১৮) গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হচ্ছে একটি হতদরিদ্র পরিবারকে। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে গাছের নিচে শিকলবন্দি অবস্থায় কাটছে বকুলের জীবন। সন্তানের এমন মানবেতর জীবন দেখে অসহায় মা-বাবার চোখে এখন শুধু কান্না।

বকুল শাখিদার উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের বামনি গ্রামের দিনমজুর আতিকুল শাখিদারের ছেলে।

বকুলের মা ববিতা বিবি জানান, বকুল তার প্রথম সন্তান। জন্মের সময় প্রসব জটিলতা দেখা দিলে নৌকাযোগে আত্রাই হাসপাতালে নেওয়ার পথে নৌকাতেই তার জন্ম হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বকুলের চলাফেরা ও আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

পরে রাজশাহীর এক শিশু চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, প্রসবের সময় শিশুটির মাথায় অতিরিক্ত চাপ পড়ায় এমন সমস্যা হয়েছে। নিয়মিত প্রায় ছয় বছর চিকিৎসা করালে সে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে বলেও চিকিৎসক জানিয়েছিলেন।

বকুলের পরিবার জানায়, ছেলের চিকিৎসার জন্য ধারদেনা ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় তিন বছর চিকিৎসা চালানো হয়। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে একপর্যায়ে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বকুলের আচরণ আরও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুরসহ বিভিন্ন সময় মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করত সে। এমনকি অনেক সময় স্থানীয়দের মারধরের শিকারও হতে হয়েছে তাকে।

পরিবারের ভাষ্য, পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়েই প্রায় ১২ বছর ধরে বাড়ির পাশের সড়কের ধারে একটি আমগাছের সঙ্গে লোহার শিকল দিয়ে বকুলকে বেঁধে রাখা হচ্ছে। সেখানেই তাকে সকাল ও দুপুরের খাবার দেওয়া হয়।

বকুলের মা ববিতা বিবি বলেন, রোদ-বৃষ্টি, শীত সবকিছুই আমার সন্তানের মাথার ওপর দিয়ে যায়। ঘরের ভেতর থেকে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার কিছুই করার নেই। বুকের ভেতর কষ্ট নিয়ে প্রতিদিন চোখের পানি ফেলি।

তিনি আরও বলেন, রাতে বকুলকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। সকালে তার ঘুম ভাঙার আগেই পায়ে শিকল পরিয়ে দিতে হয়। শিকল খুলে দিলে সে দৌড়ে চলে যায়।

বকুলের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তাদের বসতভিটা মাত্র আড়াই শতক। বকুলের বাবা অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে যে আয় করেন, তা দিয়ে কোনোমতে তিন সন্তানসহ পরিবারের সংসার চলে। ফলে বকুলের চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

ববিতা বিবি বলেন, চিকিৎসক বলেছেন, এখনো যদি সঠিকভাবে চিকিৎসা করানো যায়, তাহলে আমার ছেলে ভালো হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই। আমি চাই, আমার সন্তানটি যেন শিকলমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায়।

এ অবস্থায় বকুলের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রশাসন ও সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তার মা।

এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আবেদন পেলে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা করা হবে।