শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘মা, ফল কিনে খেয়ো’ ছেলের শেষ প্রতিশ্রুতি মনে করে কাঁদছেন নওগাঁর নার্গিস

‘শাহিন ফোন দিয়ে বলেছিল, বাবারে, আমি কিছু ফল কিনে খাই, জানিস তো তুই। আমাকে কিছু টাকা পাঠা। শাহিন বলেছিল, মা ১২ তারিখে টাকা পাঠাবো, ফল কিনে খেয়ো। কিন্তু তার আগেই আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মারা গেল। আমার বুকের ধন আমাকে একা রেখে চলে গেল। আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব, কীভাবে বাঁচব?’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রবাসী শাহিনের মা নার্গিস বেগম। ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে করে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে নওগাঁ পৌর শহরের পার নওগাঁ এলাকায় শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের শোকে পাথর হয়ে গেছেন মা নার্গিস বেগম। কিছুক্ষণ পরপরই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। স্বজনদের সান্ত্বনাতেও থামছে না তাঁর আহাজারি। শোকাহত পরিবারটিকে সমবেদনা জানাতে বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শাহিন। দেশে রেখে যান স্ত্রী, ছয় বছর বয়সী এক ছেলে, আট মাস বয়সী এক কন্যাসন্তান এবং ষাটোর্ধ্ব মা নার্গিস বেগমকে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো শাহিনের সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নেয় তাঁর প্রাণ।

নিহত শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শাহিনের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন তার বাবা মারা যান। অনেক কষ্ট করে তাকে বড় করা হয়েছে। বিয়ের পর সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে ধারদেনা করে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়। মারা যাওয়ার তিন দিন আগে সে প্রথমবারের মতো ৩২ হাজার টাকা পাঠানোর কথা জানিয়েছিল। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধে এবং বাকি টাকা সংসারের খরচ চালাতে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই টাকা আর পাঠানো হলো না।’

শাহিনের মামা আব্দুস সালাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই শাহিন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল ছিল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন পুরো পরিবার দিশেহারা। বিশেষ করে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিহতদের মরদেহ বিনা খরচে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। প্রথম দফায় গত ২৭ আগস্ট সাতজনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও পরিচয় শনাক্তের জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ সৌদি আরবের হিমঘরে রাখা ছিল। দীর্ঘ ২ মাস ২২ দিনের আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার তাঁদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়।

নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসী হলেন নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

সংসারের অভাব ঘোচাতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন শাহিন। স্বপ্ন ছিল ঋণ শোধ করবেন, মা-স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ১২ তারিখে মায়ের জন্য ফল কেনার টাকা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছেলেটিই ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

‘মা, ফল কিনে খেয়ো’ ছেলের শেষ প্রতিশ্রুতি মনে করে কাঁদছেন নওগাঁর নার্গিস

‘মা, ফল কিনে খেয়ো’ ছেলের শেষ প্রতিশ্রুতি মনে করে কাঁদছেন নওগাঁর নার্গিস

প্রকাশের সময় : ১১:৫০:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

‘শাহিন ফোন দিয়ে বলেছিল, বাবারে, আমি কিছু ফল কিনে খাই, জানিস তো তুই। আমাকে কিছু টাকা পাঠা। শাহিন বলেছিল, মা ১২ তারিখে টাকা পাঠাবো, ফল কিনে খেয়ো। কিন্তু তার আগেই আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মারা গেল। আমার বুকের ধন আমাকে একা রেখে চলে গেল। আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব, কীভাবে বাঁচব?’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রবাসী শাহিনের মা নার্গিস বেগম। ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে করে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে নওগাঁ পৌর শহরের পার নওগাঁ এলাকায় শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের শোকে পাথর হয়ে গেছেন মা নার্গিস বেগম। কিছুক্ষণ পরপরই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। স্বজনদের সান্ত্বনাতেও থামছে না তাঁর আহাজারি। শোকাহত পরিবারটিকে সমবেদনা জানাতে বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শাহিন। দেশে রেখে যান স্ত্রী, ছয় বছর বয়সী এক ছেলে, আট মাস বয়সী এক কন্যাসন্তান এবং ষাটোর্ধ্ব মা নার্গিস বেগমকে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো শাহিনের সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নেয় তাঁর প্রাণ।

নিহত শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শাহিনের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন তার বাবা মারা যান। অনেক কষ্ট করে তাকে বড় করা হয়েছে। বিয়ের পর সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে ধারদেনা করে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়। মারা যাওয়ার তিন দিন আগে সে প্রথমবারের মতো ৩২ হাজার টাকা পাঠানোর কথা জানিয়েছিল। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধে এবং বাকি টাকা সংসারের খরচ চালাতে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই টাকা আর পাঠানো হলো না।’

শাহিনের মামা আব্দুস সালাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই শাহিন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল ছিল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন পুরো পরিবার দিশেহারা। বিশেষ করে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিহতদের মরদেহ বিনা খরচে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। প্রথম দফায় গত ২৭ আগস্ট সাতজনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও পরিচয় শনাক্তের জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ সৌদি আরবের হিমঘরে রাখা ছিল। দীর্ঘ ২ মাস ২২ দিনের আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার তাঁদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়।

নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসী হলেন নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

সংসারের অভাব ঘোচাতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন শাহিন। স্বপ্ন ছিল ঋণ শোধ করবেন, মা-স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ১২ তারিখে মায়ের জন্য ফল কেনার টাকা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছেলেটিই ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।