রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুল বিক্রি করেও মেলেনি ঘর, দুই সন্তান নিয়ে রেললাইনের পাশে রেহানার জীবনযুদ্ধ

দারিদ্র্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের লড়াই। একসময় ভাড়া করা ঝুপড়ি ঘরই ছিল দুই সন্তানের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু সেই ঘরের ভাড়াও দিতে না পারায় শেষ পর্যন্ত আশ্রয় হারাতে হয়েছে রেহানা খাতুনকে। ৫০০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে নিজের মাথার চুল পর্যন্ত বিক্রি করেছেন তিনি। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে খোলা জায়গায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের বাসিন্দা রেহানা খাতুনের এমন করুণ জীবনযাপনের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর মর্মবেদনার সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ভুগছেন রেহানা। দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ঝুপড়ি ঘর ভাড়া করে বসবাস করতেন তিনি। কিন্তু নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় একপর্যায়ে সেই আশ্রয়ও হারাতে হয় তাকে। নিরুপায় হয়ে সন্তানদের নিয়ে রেললাইনের পাশের সরকারি জমিতে আশ্রয় নেন তিনি।

বর্তমানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় রেলব্রিজের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে কয়েক মাস ধরে সেটি আর পূর্ণাঙ্গ ঘরে রূপ নিতে পারেনি। টিন ও বেড়া না থাকায় প্রচণ্ড রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে রেহানার।

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম বলেন, “মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা একসময় পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন দেখি তার মাথায় চুল নেই। জিজ্ঞেস করলে কান্না করে জানায়, ৫০০ টাকা ঘরভাড়া দেওয়ার জন্য চুল বিক্রি করেছে।”

রহিম শেখ বলেন, “রেহানার অবস্থা খুবই করুণ। দুই সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত তার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হোক।”

আরেক বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, “রেহানার জন্য বাঁশের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করা গেলে সেখানে একটি ঘর তৈরি করা সম্ভব। এলাকার বিত্তবান ও মানবিক মানুষ এগিয়ে এলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ জায়গা পাবে পরিবারটি।”

সরেজমিনে দেখা যায়, সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাঁশের তৈরি একটি অসম্পূর্ণ ঘরের কাঠামো। চারপাশে নেই টিনের বেড়া, মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাদ। সেই কাঠামোর পাশেই দুই সন্তানকে নিয়ে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন দেখছেন রেহানা।

রেহানা খাতুন বলেন, “দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সহ্য করি। ঘর নেই, খাওয়ারও কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। সরকারের কাছে সাহায্য চাই। সন্তানদের নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই।”

এলাকাবাসীর দাবি, রেহানার মতো অসহায় পরিবারের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় দ্রুত একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

আত্রাইয়ে গ্রাম্য সালিশের নামে জুলুম, বিয়েতে ৩০ হাজার জরিমানা 

চুল বিক্রি করেও মেলেনি ঘর, দুই সন্তান নিয়ে রেললাইনের পাশে রেহানার জীবনযুদ্ধ

প্রকাশের সময় : ০৩:৫৯:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

দারিদ্র্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের লড়াই। একসময় ভাড়া করা ঝুপড়ি ঘরই ছিল দুই সন্তানের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু সেই ঘরের ভাড়াও দিতে না পারায় শেষ পর্যন্ত আশ্রয় হারাতে হয়েছে রেহানা খাতুনকে। ৫০০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে নিজের মাথার চুল পর্যন্ত বিক্রি করেছেন তিনি। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে খোলা জায়গায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের বাসিন্দা রেহানা খাতুনের এমন করুণ জীবনযাপনের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর মর্মবেদনার সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ভুগছেন রেহানা। দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ঝুপড়ি ঘর ভাড়া করে বসবাস করতেন তিনি। কিন্তু নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় একপর্যায়ে সেই আশ্রয়ও হারাতে হয় তাকে। নিরুপায় হয়ে সন্তানদের নিয়ে রেললাইনের পাশের সরকারি জমিতে আশ্রয় নেন তিনি।

বর্তমানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় রেলব্রিজের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে কয়েক মাস ধরে সেটি আর পূর্ণাঙ্গ ঘরে রূপ নিতে পারেনি। টিন ও বেড়া না থাকায় প্রচণ্ড রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে রেহানার।

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম বলেন, “মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা একসময় পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন দেখি তার মাথায় চুল নেই। জিজ্ঞেস করলে কান্না করে জানায়, ৫০০ টাকা ঘরভাড়া দেওয়ার জন্য চুল বিক্রি করেছে।”

রহিম শেখ বলেন, “রেহানার অবস্থা খুবই করুণ। দুই সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত তার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হোক।”

আরেক বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, “রেহানার জন্য বাঁশের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করা গেলে সেখানে একটি ঘর তৈরি করা সম্ভব। এলাকার বিত্তবান ও মানবিক মানুষ এগিয়ে এলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ জায়গা পাবে পরিবারটি।”

সরেজমিনে দেখা যায়, সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাঁশের তৈরি একটি অসম্পূর্ণ ঘরের কাঠামো। চারপাশে নেই টিনের বেড়া, মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাদ। সেই কাঠামোর পাশেই দুই সন্তানকে নিয়ে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন দেখছেন রেহানা।

রেহানা খাতুন বলেন, “দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সহ্য করি। ঘর নেই, খাওয়ারও কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। সরকারের কাছে সাহায্য চাই। সন্তানদের নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই।”

এলাকাবাসীর দাবি, রেহানার মতো অসহায় পরিবারের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় দ্রুত একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।