
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বর ও শরীর ব্যথায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যে জ্বর দেখা দিলেই অনেকে পরীক্ষা করাতে হাসপাতালে ছুটছেন। আবার কেউ কেউ পরীক্ষা না করে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করছেন। চিকিৎসকদের মতে, এতে রোগ নির্ণয়ে দেরি হওয়ার পাশাপাশি জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ঢাকার মুগদা এলাকার একটি কারখানায় কাজ করেন সুরাইয়া বেগম। গত শনিবার রাতে হঠাৎ তার শরীরে তীব্র ব্যথা ও জ্বর শুরু হয়। প্রথমে স্থানীয় একটি ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিলেও জ্বর ও ব্যথা কমেনি। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে মুগদার ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো হলে ফলাফল নেগেটিভ আসে।
সুরাইয়ার স্বামী মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ‘আমরা দুই দিন অপেক্ষা করেছি, জ্বরের ওষুধ খাইয়েছি। কিন্তু জ্বর বা শরীরের ব্যথা কোনোটাই কমছিল না। অনেকে বলছিল ডেঙ্গু হতে পারে, তাই ভীষণ ভয়ে ছিলাম। হাসপাতালে তিনটি পরীক্ষা করাতে এক হাজার টাকা খরচ হয়েছে, তবে ডেঙ্গু নেগেটিভ এসেছে।’
চিকিৎসকদের ভাষ্য, নানা ধরনের সংক্রমণের অন্যতম প্রধান উপসর্গ জ্বর। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ভাইরাস জ্বরেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। এটি ছোঁয়াচে হওয়ায় পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রাজধানীসহ সারাদেশে জ্বরের প্রকোপ বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি সচেতনতাও বেড়েছে। অনেকেই জ্বর আসার পরপরই ডেঙ্গু পরীক্ষা করাচ্ছেন। তবে অনেকে আবার পরীক্ষার খরচের কথা চিন্তা করে ফার্মেসি থেকে নাপা বা অন্যান্য ওষুধ কিনে খাচ্ছেন। এতে সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত না হওয়ায় ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আগস্ট মাস থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও তীব্র হয়েছে। শিশু থেকে বয়স্ক—সব বয়সী মানুষই মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডেঙ্গুর প্রাথমিক উপসর্গের অন্যতম জ্বর হওয়ায় অনেক সময় সাধারণ জ্বর ও ডেঙ্গুর মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে।
গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল মুগদা, মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সান ডায়াগনস্টিক, মুগদা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ইমেজিং সেন্টার এবং ইনসাইট ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে সরেজমিনে দেখা যায়, জ্বর নিয়ে অনেক মানুষ ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে এসেছেন। কেউ একা, আবার কেউ পরিবারের একাধিক সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হয়েছেন।
মুগদার বাসিন্দা আব্দুল কাদের কয়েক দিন ধরে জ্বর ও শরীর ব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি বলেন, ‘ভাবলাম সাধারণ জ্বর। তাই নাপা বা এইচ খেয়ে ভালো হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু জ্বর কমার পর আবার বাড়ছিল। পরে ডেঙ্গু সন্দেহে পরীক্ষা করিয়েছি।’
সম্প্রতি আবু তালেবের পরিবারের সাত সদস্যের মধ্যে ছয়জনই একসঙ্গে জ্বরে আক্রান্ত হন। তিনি জানান, একজনের কাছ থেকে আরেকজনের মধ্যে জ্বর ছড়িয়ে পড়ায় তারা এটিকে ভাইরাস জ্বর বলে ধারণা করেন। এরপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য অসুস্থ পরিবারের সদস্যদের ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো হয়। সবার রিপোর্টই নেগেটিভ আসে।
তবে সবার মধ্যে পরীক্ষা করানোর আগ্রহ নেই। মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার জ্বর হলে সবাই পরীক্ষা করাতে বলেছিল। কিন্তু নাপা খেয়েই ভালো হয়ে গেছি। ৫০ টাকার ওষুধে যদি জ্বর সেরে যায়, তাহলে অযথা এক হাজার টাকা খরচ করে টেস্ট কেন করাব?’
চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডেঙ্গু শনাক্তে সাধারণত এনএস১ অ্যান্টিজেন, অ্যান্টিবডি ও সিবিসি (প্লাটিলেট কাউন্টসহ) পরীক্ষা করা হয়। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা জটিল হলে বা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে আরও কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. নন্দিতা পাল বলেন, ‘প্রচুর মানুষ এখন জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন, কিন্তু অনেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বর হওয়ার তিন দিনের মধ্যেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করা জরুরি। জ্বর কমে গেলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে বিপদ কেটে গেছে। কারণ অনেক সময় জ্বর কমার পরই শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে। আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৬২ হাজার ১১৭ জন।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭৩ জন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭৯ জন, ঢাকা বিভাগে ৪০৫ জন, খুলনা বিভাগে ২৮০ জন, বরিশালে ১৭৮ জন, চট্টগ্রামে ৩১৭ জন, ময়মনসিংহে ১১৩ জন, রংপুরে ৫৯ জন, সিলেটে ৮ জন এবং রাজশাহীতে ১৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০৪ জন। এর আগে আগস্টে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ৪৩ জনের মৃত্যু হয়। ওই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬ জন। চলতি সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৩১ হাজার ৫২১ জনে পৌঁছেছে।
এদিকে, সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকারের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে এবং হাসপাতালে প্রয়োজনীয় স্যালাইনের কোনো ঘাটতি নেই। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোবাইল হাসপাতাল ও সেনাবাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর অধিকাংশ চিকিৎসাই উপজেলা পর্যায়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু অনেক রোগী সরাসরি বিশেষায়িত বা টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতালে চলে আসায় সেখানে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
আমাদের আত্রাই ডেস্ক রিপোর্ট 


















