বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগেই বিয়ে ৪৭.২ শতাংশ নারীর, উদ্বেগ ইউনিসেফের

  • আ.আ. নিউজ ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ১০:৪৪:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের উচ্চ হার এখনো উদ্বেগজনক। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। একই বয়সী নারীদের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্যের ভিত্তিতে এ চিত্র তুলে ধরেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, বাল্যবিবাহ মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বাল্যবিবাহ বন্ধ, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল।

শিশুদের কল্যাণে তিনটি পদক্ষেপের আহ্বান

বাংলাদেশে তিন দিনের সফর শেষে শিশুদের সুরক্ষা ও উন্নয়নে তিনটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান ক্যাথরিন রাসেল।

প্রথমত, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি মেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পেয়েছে ১৪ বছরের বুশরা

বাংলাদেশ সফরকালে ঢাকার কড়াইল বস্তির বিভিন্ন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক। এ ছাড়া কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন তিনি।

সফরে ১৪ বছর বয়সী বুশরার বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন রাসেল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের কমিউনিটি নেতারা বুশরার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এই বাল্যবিবাহ ঠেকাতে ভূমিকা রাখেন।

ক্যাথরিন রাসেল বলেন, মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত উন্নয়নেই নয়, বরং সমাজ ও বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনেও অবদান রাখবে।

বাল্যবিবাহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মেয়েদের ভবিষ্যৎ

ইউনিসেফের মতে, বাল্যবিবাহের ফলে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি অল্প বয়সে গর্ভধারণের আশঙ্কা তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে নিজেদের যোগ্যতা বিকাশ ও জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

এ কারণে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ

বাংলাদেশ সফরের সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক। এ সময় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সরকারি অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রাসেল বলেন, বাজেটের মাধ্যমেই সরকারের অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ করা মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করা।

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টির প্রশংসা করে ক্যাথরিন রাসেল বলেন, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা ইতিমধ্যে অনেক কিছু হারিয়েছে। তাদের যেন শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

ইউনিসেফের বক্তব্য অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং শিশুদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশের শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

নওগাঁয় বৃদ্ধা হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন, ছোট ভাই-ভাবীসহ গ্রেপ্তার ৫

বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগেই বিয়ে ৪৭.২ শতাংশ নারীর, উদ্বেগ ইউনিসেফের

প্রকাশের সময় : ১০:৪৪:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের উচ্চ হার এখনো উদ্বেগজনক। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। একই বয়সী নারীদের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্যের ভিত্তিতে এ চিত্র তুলে ধরেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, বাল্যবিবাহ মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বাল্যবিবাহ বন্ধ, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল।

শিশুদের কল্যাণে তিনটি পদক্ষেপের আহ্বান

বাংলাদেশে তিন দিনের সফর শেষে শিশুদের সুরক্ষা ও উন্নয়নে তিনটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান ক্যাথরিন রাসেল।

প্রথমত, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি মেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পেয়েছে ১৪ বছরের বুশরা

বাংলাদেশ সফরকালে ঢাকার কড়াইল বস্তির বিভিন্ন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক। এ ছাড়া কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন তিনি।

সফরে ১৪ বছর বয়সী বুশরার বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন রাসেল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের কমিউনিটি নেতারা বুশরার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এই বাল্যবিবাহ ঠেকাতে ভূমিকা রাখেন।

ক্যাথরিন রাসেল বলেন, মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত উন্নয়নেই নয়, বরং সমাজ ও বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনেও অবদান রাখবে।

বাল্যবিবাহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মেয়েদের ভবিষ্যৎ

ইউনিসেফের মতে, বাল্যবিবাহের ফলে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি অল্প বয়সে গর্ভধারণের আশঙ্কা তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে নিজেদের যোগ্যতা বিকাশ ও জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

এ কারণে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ

বাংলাদেশ সফরের সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক। এ সময় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সরকারি অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রাসেল বলেন, বাজেটের মাধ্যমেই সরকারের অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ করা মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করা।

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টির প্রশংসা করে ক্যাথরিন রাসেল বলেন, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা ইতিমধ্যে অনেক কিছু হারিয়েছে। তাদের যেন শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

ইউনিসেফের বক্তব্য অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং শিশুদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশের শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।