মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঐতিহ্য আর প্রযুক্তির মেলবন্ধনে বদলে যাচ্ছে আত্রাইয়ের শুঁটকি তৈরির চিত্র

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : ০৬:৫৭:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

একসময় খোলা আকাশের নিচে বাঁশের মাচায় রোদে শুকানো মাছের সারি ছিল যে গ্রামের চিরচেনা দৃশ্য, সেই গ্রামেই এখন লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বৃষ্টি, কুয়াশা ও ধুলাবালির ঝুঁকি কমিয়ে মাছ শুকানোর কাজে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তি। এতে একদিকে যেমন শুঁটকি তৈরির সময় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে পণ্যের পরিচ্ছন্নতা ও গুণগত মান। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পে এমন পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য পরিচিত ভরতেঁতুলিয়া গ্রামে বংশপরম্পরায় মাছ শুকিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন অনেক মানুষ। আত্রাই-ছোট যমুনা নদী ও স্থানীয় বিল থেকে সংগ্রহ করা টেংরা, পুঁটি, খলসে, টাকি, শোল, চাঁদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ দিয়ে তৈরি হয় এখানকার শুঁটকি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সুনাম রয়েছে সীমান্তের ওপারেও।

তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হতো ব্যবসায়ীদের। খোলা জায়গায় মাছ শুকানোর কারণে ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শে আসত মাছ। হঠাৎ বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত কুয়াশায় নষ্ট হয়ে যেত অনেক মাছ। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের মুখেও পড়তে হতো ব্যবসায়ীদের।

এমন বাস্তবতায় প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান। তাঁর উদ্যোগে চালু হয়েছে ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’। স্বচ্ছ পলিথিন শিটে ঘেরা এই বিশেষ কাঠামোর ভেতরে সূর্যের তাপে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এক্সহস্ট ফ্যানের সাহায্যে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকায় মাছের আর্দ্রতা দ্রুত কমে আসে। ফলে তুলনামূলক কম সময়ে মাছ শুকানো সম্ভব হচ্ছে।

উদ্যোক্তার দাবি, প্রচলিত পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করতে যেখানে পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে, সেখানে এই প্রযুক্তিতে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় মাছ শুকানো যাচ্ছে। এতে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমছে এবং উৎপাদন কার্যক্রমও থাকছে সচল। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ শুকানোর ফলে ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পণ্যের নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে যথাযথ তাপমাত্রা, পরিচ্ছন্নতা এবং সংরক্ষণব্যবস্থা বজায় রাখাও জরুরি।

উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান বলেন, আগে খোলা মাঠে বাঁশের মাচায় মাছ শুকাতাম। হঠাৎ বৃষ্টি কিংবা ধুলাবালির কারণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মাছ নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হতো। সেই ক্ষতি কমানো এবং স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরির চিন্তা থেকেই ইউটিউব ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে আধুনিক ড্রায়ার সম্পর্কে জানতে পারি। পরে নিজ উদ্যোগে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনলাইনের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও আমাদের শুঁটকির চাহিদা বাড়ছে।

বিশেষ করে পরিচ্ছন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করা মাছের প্রতি স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। তবে ছোট পরিসরে উৎপাদন করায় চাহিদা অনুযায়ী শুঁটকি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বাইরেও শুঁটকি রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা ব্যবসায়ীরাও আধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন। তাঁদের মতে, নতুন এই পদ্ধতিতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। তবে প্রয়োজনীয় পুঁজি ও আর্থিক সহযোগিতার অভাবে অনেক ব্যবসায়ী এখনো পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা বৃষ্টি ও কুয়াশা। মাছ একবার ভিজে গেলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাকিবুল যেভাবে ড্রায়ারের মাধ্যমে কম সময়ে মাছ শুকাচ্ছে, তাতে ঝুঁকি কমানোর ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরাও এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাই, কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যবসায়ী রিপন আকন্দ ও মঞ্জু মোল্লা বলেন, আমরা বংশপরম্পরায় রোদে ও বাঁশের মাচায় মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করছি। আমাদের তৈরি শুঁটকির স্বাদ ও ঐতিহ্য আলাদা। কিন্তু বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত কুয়াশার কারণে প্রায়ই মাছ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে এই সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ ও সরকারি সহযোগিতা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভরতেঁতুলিয়ার শুঁটকি শিল্পকে আধুনিকায়ন করা গেলে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই নয়, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তাদের আয় বাড়ানোরও সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত প্যাকেজিং ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান বলেন, আত্রাই উপজেলায় বর্তমানে একটি প্রকল্পের আওতায় মাত্র একজন উদ্যোক্তা ‘গ্রিন হাউস ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদন করছেন। আধুনিক এ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদনের পাশাপাশি এর গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব। আমরা উপজেলা মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে ওই উদ্যোক্তাকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছি। পাশাপাশি, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে শুঁটকি উৎপাদনে আগ্রহী অন্য উদ্যোক্তারাও এগিয়ে এলে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হবে। আমরা চাই, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আত্রাইয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদনের প্রসার ঘটুক।

নওগাঁ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস আলী বলেন, আত্রাইয়ের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পে ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তির ব্যবহার একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ শুকানো সম্ভব হওয়ায় শুঁটকির গুণগত মান বজায় রাখা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এ শিল্পের প্রসারে ক্লাস্টারভিত্তিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি প্রণোদনার আওতায় উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নিরাপদ ও মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় চাহিদা পূরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

আত্রাইয়ে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

ঐতিহ্য আর প্রযুক্তির মেলবন্ধনে বদলে যাচ্ছে আত্রাইয়ের শুঁটকি তৈরির চিত্র

প্রকাশের সময় : ০৬:৫৭:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

একসময় খোলা আকাশের নিচে বাঁশের মাচায় রোদে শুকানো মাছের সারি ছিল যে গ্রামের চিরচেনা দৃশ্য, সেই গ্রামেই এখন লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বৃষ্টি, কুয়াশা ও ধুলাবালির ঝুঁকি কমিয়ে মাছ শুকানোর কাজে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তি। এতে একদিকে যেমন শুঁটকি তৈরির সময় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে পণ্যের পরিচ্ছন্নতা ও গুণগত মান। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পে এমন পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য পরিচিত ভরতেঁতুলিয়া গ্রামে বংশপরম্পরায় মাছ শুকিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন অনেক মানুষ। আত্রাই-ছোট যমুনা নদী ও স্থানীয় বিল থেকে সংগ্রহ করা টেংরা, পুঁটি, খলসে, টাকি, শোল, চাঁদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ দিয়ে তৈরি হয় এখানকার শুঁটকি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সুনাম রয়েছে সীমান্তের ওপারেও।

তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হতো ব্যবসায়ীদের। খোলা জায়গায় মাছ শুকানোর কারণে ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শে আসত মাছ। হঠাৎ বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত কুয়াশায় নষ্ট হয়ে যেত অনেক মাছ। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের মুখেও পড়তে হতো ব্যবসায়ীদের।

এমন বাস্তবতায় প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান। তাঁর উদ্যোগে চালু হয়েছে ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’। স্বচ্ছ পলিথিন শিটে ঘেরা এই বিশেষ কাঠামোর ভেতরে সূর্যের তাপে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এক্সহস্ট ফ্যানের সাহায্যে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকায় মাছের আর্দ্রতা দ্রুত কমে আসে। ফলে তুলনামূলক কম সময়ে মাছ শুকানো সম্ভব হচ্ছে।

উদ্যোক্তার দাবি, প্রচলিত পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করতে যেখানে পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে, সেখানে এই প্রযুক্তিতে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় মাছ শুকানো যাচ্ছে। এতে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমছে এবং উৎপাদন কার্যক্রমও থাকছে সচল। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ শুকানোর ফলে ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পণ্যের নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে যথাযথ তাপমাত্রা, পরিচ্ছন্নতা এবং সংরক্ষণব্যবস্থা বজায় রাখাও জরুরি।

উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান বলেন, আগে খোলা মাঠে বাঁশের মাচায় মাছ শুকাতাম। হঠাৎ বৃষ্টি কিংবা ধুলাবালির কারণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মাছ নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হতো। সেই ক্ষতি কমানো এবং স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরির চিন্তা থেকেই ইউটিউব ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে আধুনিক ড্রায়ার সম্পর্কে জানতে পারি। পরে নিজ উদ্যোগে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনলাইনের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও আমাদের শুঁটকির চাহিদা বাড়ছে।

বিশেষ করে পরিচ্ছন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করা মাছের প্রতি স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। তবে ছোট পরিসরে উৎপাদন করায় চাহিদা অনুযায়ী শুঁটকি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বাইরেও শুঁটকি রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা ব্যবসায়ীরাও আধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন। তাঁদের মতে, নতুন এই পদ্ধতিতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। তবে প্রয়োজনীয় পুঁজি ও আর্থিক সহযোগিতার অভাবে অনেক ব্যবসায়ী এখনো পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা বৃষ্টি ও কুয়াশা। মাছ একবার ভিজে গেলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাকিবুল যেভাবে ড্রায়ারের মাধ্যমে কম সময়ে মাছ শুকাচ্ছে, তাতে ঝুঁকি কমানোর ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরাও এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাই, কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যবসায়ী রিপন আকন্দ ও মঞ্জু মোল্লা বলেন, আমরা বংশপরম্পরায় রোদে ও বাঁশের মাচায় মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করছি। আমাদের তৈরি শুঁটকির স্বাদ ও ঐতিহ্য আলাদা। কিন্তু বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত কুয়াশার কারণে প্রায়ই মাছ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে এই সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ ও সরকারি সহযোগিতা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভরতেঁতুলিয়ার শুঁটকি শিল্পকে আধুনিকায়ন করা গেলে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই নয়, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তাদের আয় বাড়ানোরও সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত প্যাকেজিং ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান বলেন, আত্রাই উপজেলায় বর্তমানে একটি প্রকল্পের আওতায় মাত্র একজন উদ্যোক্তা ‘গ্রিন হাউস ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদন করছেন। আধুনিক এ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদনের পাশাপাশি এর গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব। আমরা উপজেলা মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে ওই উদ্যোক্তাকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছি। পাশাপাশি, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে শুঁটকি উৎপাদনে আগ্রহী অন্য উদ্যোক্তারাও এগিয়ে এলে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হবে। আমরা চাই, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আত্রাইয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদনের প্রসার ঘটুক।

নওগাঁ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস আলী বলেন, আত্রাইয়ের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পে ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তির ব্যবহার একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ শুকানো সম্ভব হওয়ায় শুঁটকির গুণগত মান বজায় রাখা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এ শিল্পের প্রসারে ক্লাস্টারভিত্তিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি প্রণোদনার আওতায় উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নিরাপদ ও মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় চাহিদা পূরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।