
নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলা আজ ‘মাছের ভাণ্ডার’ হিসেবে যে পরিচিতি লাভ করেছে, তা একদিনে আসেনি। প্রাকৃতিক জলাশয়, পরিশ্রমী চাষি ও সক্রিয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই সম্ভাবনাময় মৎস্য আড়ৎ। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সাপ্তাহিক আমাদের আত্রাই পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে ‘আত্রাইয়ে আড়তে প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকার মাছ কেনাবেচার’ তথ্য আত্রাই মৎস্য আড়তের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।
প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাঁক-ডাক, দরদাম আর ব্যস্ততায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো আড়ৎ এলাকা। শুধু আত্রাই নয়, আশপাশের উপজেলা ও দূরদূরান্ত থেকে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির মাছ এখানে আসে। রুই, কাতলা, বোয়াল, আইড়, শিং, কৈ, টেংরা, পুঁটি থেকে শুরু করে চিংড়ি ও গুলশা-সব মিলিয়ে এটি সত্যিই একটি সমৃদ্ধ মৎস্য বাজার। এখান থেকে মাছ সরবরাহ হচ্ছে নওগাঁ, নাটোর, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম এমনকি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে।
আত্রাই উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য বলছে, চাহিদার তুলনায় এখানে প্রায় তিনগুণ বেশি মাছ উৎপাদন হচ্ছে। এই উদ্বৃত্ত উৎপাদন স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে এই আড়ৎগুলোর ওপর। তবে এত সম্ভাবনার মাঝেও উদ্বেগজনক বাস্তবতা রয়েছে। অতিরিক্ত শীত, নদ-নদীতে অবাধে চায়না দুয়ারি জাল ও সুতি জালের ব্যবহার, বিষ প্রয়োগসহ অবৈধ কর্মকাণ্ডে দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে দেশি মাছের সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। অন্যদিকে অবকাঠামোগত দুর্বলতাও বড় সমস্যা। আড়ৎ এলাকায় ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সবচেয়ে বড় অভাব একটি আধুনিক হিমাগারের। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় সময়মতো মাছ বিক্রি করতে না পারলে চাষি ও ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাদের লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আত্রাইয়ের মৎস্য আড়ৎ কেবল একটি বাজার নয়-এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কেন্দ্র। তাই এই আড়ৎকে টেকসই ও আধুনিক করতে দ্রুত উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, হিমাগার স্থাপন এবং অবৈধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালানো জরুরি। সরকারি উদ্যোগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপই পারে আত্রাইয়ের এই ‘মাছের ভাণ্ডার’কে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে। সময়ের দাবি উপেক্ষা না করে এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আত্রাই মৎস্য আড়ৎ শুধু স্থানীয় নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে একটি আদর্শ মৎস্য বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে-এই প্রত্যাশাই আজ সকলের।
প্রতিবেদকের নাম 















