সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬,
১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নওগাঁয় আতপ চালের কেজিতে ৯০ টাকা বৃদ্ধি

দেশের অন্যতম চাল উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে চালের দাম। বিশেষ করে সুগন্ধি আতপ চালের বাজারে নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি সুগন্ধি আতপ চালের দাম ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ২১০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ৯০ টাকা। পাশাপাশি কাটারি, বিআর-২৮, স্বর্ণা-৫সহ প্রায় সব ধরনের সরু চালের দামও কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

নওগাঁ শহরের বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, তিন সপ্তাহ আগে ৭৬ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া কাটারি চাল এখন ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিআর-২৮ চালের দাম ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা এবং স্বর্ণা-৫ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকা কেজিতে। তবে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে সুগন্ধি আতপ চালের বাজারে, যেখানে অল্প সময়ের ব্যবধানে কেজিতে ৯০ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। নওগাঁ সদর উপজেলার ডাক্তারের মোড় এলাকার বাসিন্দা মোসলেম উদ্দিন বলেন, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৫ কেজি আতপ চাল কিনতে এসে প্রতি কেজিতে ৯০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। এভাবে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

উপজেলার বালুভরা গ্রামের কৃষক আল ফারুক বলেন, চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। যারা দিন এনে দিন খান, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি কষ্টের।

মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিব্রত খুচরা ব্যবসায়ীরাও। নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, প্রায় ৪০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে সুগন্ধি আতপ চালের এমন মূল্যবৃদ্ধি কখনও দেখেননি। প্রতিদিনই ক্রেতাদের অসন্তোষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাজারের কিছু ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, মৌসুমের শুরুতেই বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ চাল মজুত করায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে এবং এর প্রভাবেই দাম বেড়েছে।

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে মিল মালিক ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সরকার অনুমোদিত নীতিমালার মধ্যেই চাল মজুত করা হয়েছে। তাদের দাবি, বিদেশে সুগন্ধি আতপ চাল রপ্তানি এবং ধানের উচ্চমূল্যই চালের বাজারে প্রভাব ফেলছে।

মফিজ উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, সরকার কয়েক মাস ধরেই সুগন্ধি আতপ চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। ফলে স্থানীয় বাজারে এই চালের সরবরাহ কমেছে। একই সঙ্গে আতপ চালের বিকল্প হিসেবে ক্রেতারা কাটারিসহ অন্যান্য সরু চাল কিনছেন, যার কারণে সেসব চালের দামও বেড়েছে।

নওগাঁ চাউলকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ধানের দাম বাড়ায় চাল উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়েছে। বর্তমানে কাটারি ধান প্রতি মণ প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং সুগন্ধি ধান প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে চালের দাম বাড়া স্বাভাবিক বলে তিনি মনে করেন।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার জানান, আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬১ হাজার মেট্রিক টন সুগন্ধি আতপ চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। এর প্রভাবেই বাজারে কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। তবে অবৈধ মজুত ঠেকাতে জেলার প্রায় ৪৫০টি অটোমেটিক ও হাসকিং মিল নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

চালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে নওগাঁসহ আশপাশের জেলার সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

পরিবেশ রক্ষায় নওগাঁয় সাতদিনব্যাপী বৃক্ষ মেলা শুরু

নওগাঁয় আতপ চালের কেজিতে ৯০ টাকা বৃদ্ধি

প্রকাশের সময় : ০৪:১৬:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

দেশের অন্যতম চাল উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে চালের দাম। বিশেষ করে সুগন্ধি আতপ চালের বাজারে নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি সুগন্ধি আতপ চালের দাম ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ২১০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ৯০ টাকা। পাশাপাশি কাটারি, বিআর-২৮, স্বর্ণা-৫সহ প্রায় সব ধরনের সরু চালের দামও কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

নওগাঁ শহরের বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, তিন সপ্তাহ আগে ৭৬ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া কাটারি চাল এখন ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিআর-২৮ চালের দাম ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা এবং স্বর্ণা-৫ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকা কেজিতে। তবে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে সুগন্ধি আতপ চালের বাজারে, যেখানে অল্প সময়ের ব্যবধানে কেজিতে ৯০ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। নওগাঁ সদর উপজেলার ডাক্তারের মোড় এলাকার বাসিন্দা মোসলেম উদ্দিন বলেন, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৫ কেজি আতপ চাল কিনতে এসে প্রতি কেজিতে ৯০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। এভাবে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

উপজেলার বালুভরা গ্রামের কৃষক আল ফারুক বলেন, চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। যারা দিন এনে দিন খান, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি কষ্টের।

মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিব্রত খুচরা ব্যবসায়ীরাও। নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, প্রায় ৪০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে সুগন্ধি আতপ চালের এমন মূল্যবৃদ্ধি কখনও দেখেননি। প্রতিদিনই ক্রেতাদের অসন্তোষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাজারের কিছু ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, মৌসুমের শুরুতেই বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ চাল মজুত করায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে এবং এর প্রভাবেই দাম বেড়েছে।

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে মিল মালিক ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সরকার অনুমোদিত নীতিমালার মধ্যেই চাল মজুত করা হয়েছে। তাদের দাবি, বিদেশে সুগন্ধি আতপ চাল রপ্তানি এবং ধানের উচ্চমূল্যই চালের বাজারে প্রভাব ফেলছে।

মফিজ উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, সরকার কয়েক মাস ধরেই সুগন্ধি আতপ চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। ফলে স্থানীয় বাজারে এই চালের সরবরাহ কমেছে। একই সঙ্গে আতপ চালের বিকল্প হিসেবে ক্রেতারা কাটারিসহ অন্যান্য সরু চাল কিনছেন, যার কারণে সেসব চালের দামও বেড়েছে।

নওগাঁ চাউলকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ধানের দাম বাড়ায় চাল উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়েছে। বর্তমানে কাটারি ধান প্রতি মণ প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং সুগন্ধি ধান প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে চালের দাম বাড়া স্বাভাবিক বলে তিনি মনে করেন।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার জানান, আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬১ হাজার মেট্রিক টন সুগন্ধি আতপ চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। এর প্রভাবেই বাজারে কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। তবে অবৈধ মজুত ঠেকাতে জেলার প্রায় ৪৫০টি অটোমেটিক ও হাসকিং মিল নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

চালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে নওগাঁসহ আশপাশের জেলার সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।