
বাংলার পঞ্জিকা অনুযায়ী দেশে আমের মৌসুম শেষ হয়েছে বেশ আগেই। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে যেন তার ব্যতিক্রম। রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় এখনো গাছে গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় সুস্বাদু আম। বিশেষ করে কাটিমনসহ বিভিন্ন জাতের আমে বাগানগুলোতে দেখা দিয়েছে ভিন্ন এক আমের মৌসুম। গ্রামীণ সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় পথচারীদেরও দৃষ্টি কাড়ছে এসব বাগানের ঝুলন্ত আম।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বরেন্দ্রভূমির গোদাগাড়ী, তানোরের মুন্ডুমালা থেকে কলমা সড়ক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা থেকে নাচোল-আড্ডা এবং নওগাঁর পোরশা-নিয়ামতপুর সড়কের দুই পাশে ছোট-বড় বিভিন্ন বাগানে থোকায় থোকায় আম ঝুলছে। মৌসুমের বাইরে এমন দৃশ্য অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি করছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার মরিয়ম আহম্মেদ জানান, কাটিমন বা সুইট কাটিমন থাইল্যান্ড থেকে আনা একটি জাত। দেশীয় প্রচলিত জাতের তুলনায় এটি মৌসুমের বাইরেও চাষ করা যায়। ফলে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও রয়েছে। মৌসুমের বাইরে বাজারে এ আমের চাহিদা বেশি থাকায় চাষিরা বছরে দুবার পর্যন্ত আম সংগ্রহ করে ভালো দাম পাচ্ছেন। এ কারণে দিন দিন কাটিমন চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
স্থানীয় কয়েকজন আমচাষি জানান, মৌসুমের সময় খিরসাপাত আমের মুকুল ভেঙে দিলে পরবর্তী সময়ে দেরিতে আবার মুকুল আসে। এতে কয়েক মাস পর গাছে আম পরিপক্ব হয়। অসময়ে বাজারে ওঠায় এসব আমের দামও তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। বর্তমানে এ ধরনের আম ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তারা।
গোদাগাড়ীর বিশ্বনাথপুর বাজারের ৫০ বিঘা মিশ্র আমবাগানের মালিক কৃষক মো. মিজানুর রহমান জানান, কাটিমন পাকা আম অত্যন্ত সুমিষ্ট। ছোট আঁটি ও আঁশহীন হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি কাটিমন ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। বছরে দুবার আম সংগ্রহ করে তিনি কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন।
তানোর উপজেলার কৃষক তাবারক হোসেন জানান, দেশীয় জাতের আম চাষে লাভ কম হওয়ায় তিনি সেগুলোর পরিবর্তে ২৫ বিঘা জমিতে প্রায় আড়াই হাজার কাটিমন গাছ লাগিয়েছেন। ভালো ফলন হলে এ বাগান থেকে তিনি উল্লেখযোগ্য আয় করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিশালবাড়ী বাজারের আম বিক্রেতা সুমন আলী বলেন, মৌসুমের সময় দেশীয় আম কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে অনেক সময় লোকসান হয়। কিন্তু বর্তমানে সুস্বাদু ও আঁশহীন কাটিমন আমের চাহিদা অনেক বেশি। বাজারে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩৩০ টাকা দরে এ আম বিক্রি হচ্ছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার ইনকিলাবকে জানান, সঠিক প্রযুক্তি, পরিচর্যা ও সময় ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে খিরসাপাত আমের লেট চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বাড়বে। পাশাপাশি আম উৎপাদনে তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা। তিনি বলেন, থাই বারোমাসি জাতের সুইট কাটিমন অত্যন্ত মিষ্টি, আঁশহীন ও পাতলা আঁটিযুক্ত হওয়ায় বাড়ির ছাদবাগান কিংবা টবেও সহজে চাষ করা যায়।
সব মিলিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক দিয়ে চলাচল করলে এখন চোখে পড়ছে ছোট-বড় বাগানে ঝুলে থাকা কাটিমন ও খিরসাপাত আম। মৌসুম শেষ হওয়ার পরও গাছে গাছে আমের এমন উপস্থিতি যেন জানান দিচ্ছে—বরেন্দ্রে আমের উৎসব এখন আর শুধু একটি মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই, বারোমাসই মিলছে আমের স্বাদ।
গোদাগাড়ী প্রতিনিধি 



















