
বর্ষার পানিতে টইটম্বুর চলনবিল। অথচ বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর এখন চোখে পড়ে কেবল কচুরিপানার সবুজ আস্তরণ। একসময় লাল-সাদা শাপলা, নানা প্রজাতির পাখির বিচরণ ও নৌকার চলাচলে প্রাণবন্ত থাকা বিলের অনেক অংশই এখন কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। এতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কমার পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, মাছ আহরণ ও নৌচলাচল। দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক, জেলে, মাঝি ও পর্যটকরা।
নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া উপজেলার চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় কচুরিপানার বিস্তার দেখা গেছে। সরেজমিনে বিলের বিভিন্ন অংশে মাইলের পর মাইল পানির ওপর কচুরিপানার স্তর ভাসতে দেখা যায়। স্থানীয়দের মতে, বর্ষা মৌসুমে কচুরিপানার এই বিস্তার প্রতিবছরই বাড়ছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও জলজ পরিবেশেও পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।
বর্ষাকালে চলনবিল এলাকার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নৌকা। কিন্তু ঘন কচুরিপানার কারণে অনেক এলাকায় নৌকা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার পাখায় কচুরিপানা জড়িয়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে নৌকা থামিয়ে তা পরিষ্কার করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে।
মাঝি আশরাফ হোসেন বলেন, “কচুরিপানার কারণে নৌকা চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। ইঞ্জিনের ফ্যানে কচুরিপানা আটকে যায়। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। বাধ্য হয়ে দূরের পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও জ্বালানি দুটোই বেশি লাগে।”
কচুরিপানার কারণে চলনবিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকরাও বিড়ম্বনায় পড়ছেন। নওগাঁর আত্রাই থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, “চলনবিলের সৌন্দর্যের কথা শুনে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি অনেক জায়গাই কচুরিপানায় ঢাকা। নৌকাও কয়েকবার কচুরিপানার মধ্যে আটকে গেছে।”
তবে কচুরিপানার বিস্তার নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে। বিলের পানি কমে যাওয়ার পর জমি প্রস্তুত করে আমন ধান, সরিষা, গমসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করেন কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণ করতে বাড়তি শ্রম ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
কৃষক ফরিদ হোসেন বলেন, “জমি চাষের আগে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়। বন্যার ক্ষতি সামলানোর পর এই বাড়তি খরচ কৃষকদের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়ায়। টাকা দিলেও অনেক সময় প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যায় না। প্রতিবছর কচুরিপানা পরিষ্কার করি, কিন্তু বর্ষায় আবার কয়েক গুণ বেড়ে যায়।”
আরেক কৃষক জহুরুল ইসলাম বলেন, “কচুরিপানা সরাতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক কৃষক জমি অনাবাদি রাখার কথাও ভাবছেন।”
নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুর ইসলাম খান বলেন, “চলনবিলে কচুরিপানার বিস্তারের কারণে কৃষকেরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। জমি পরিষ্কার করতে তাঁদের অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে ফসল উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কচুরিপানা অপসারণের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
স্থানীয়দের মতে, কচুরিপানা অপসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে নৌচলাচল স্বাভাবিক করার পাশাপাশি কৃষিকাজ ও মৎস্য আহরণেও সুবিধা হবে। একই সঙ্গে চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনাও ধরে রাখা সম্ভব হবে।
নাটোর প্রতিনিধি 


















