শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে গুল খাইয়ে হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন এবং জোর করে তামাকজাত পদার্থ ‘গুল’ খাইয়ে হত্যার দায়ে ফরিদপুরে মো. জিল্লুর মোল্যা নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন। ঘটনার দীর্ঘ সাড়ে সাত বছর পর মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হলো।

আদালত ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙ্গা গ্রামের আছাদ মোল্যার ছেলে জিল্লুর মোল্যার সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন জিল্লুর। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রায়ই বিরোধ ও কলহ সৃষ্টি হতো।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ বিকেল ৩টার দিকে স্বজনেরা খবর পান, দুপুর ১টার দিকে স্বামীর বাড়িতে ওই নারী ‘গুল’ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। খবর পেয়ে তাঁরা আলফাডাঙ্গায় জিল্লুর মোল্যার বাড়িতে গিয়ে উঠানের একটি চৌকির ওপর ওই নারীর মরদেহ দেখতে পান।

এ ঘটনায় আলফাডাঙ্গা থানায় অপমৃত্যুর মামলা ও পরে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ তদন্তে নেমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে কাজ শুরু করে। মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন আলফাডাঙ্গা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নাজিমুদ্দিন।

তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, ওই নারীর মৃত্যু আত্মহত্যার কারণে হয়নি। বরং জোরপূর্বক তামাকজাত পদার্থ ‘গুল’ খাওয়ানোর ফলে অতিরিক্ত নিকোটিনের বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তে ভুক্তভোগীর শ্বাসনালি ও পরিপাকতন্ত্রে ‘গুল’-এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। চিকিৎসকের মতামত অনুযায়ী, বিষক্রিয়ার কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত গুরুতর জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

তদন্ত শেষে জিল্লুর মোল্যাকে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নাজিমুদ্দিন। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। এসব সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া রতন বলেন, যৌতুকের জন্য গৃহবধূকে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় আদালতের এ রায় দৃষ্টান্তমূলক। এর মাধ্যমে যৌতুকলোভী ও নির্যাতনকারীদের প্রতি বিচার বিভাগের কঠোর অবস্থানের বার্তা পৌঁছাবে।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে গুল খাইয়ে হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে গুল খাইয়ে হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

প্রকাশের সময় : ১০:০৮:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন এবং জোর করে তামাকজাত পদার্থ ‘গুল’ খাইয়ে হত্যার দায়ে ফরিদপুরে মো. জিল্লুর মোল্যা নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন। ঘটনার দীর্ঘ সাড়ে সাত বছর পর মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হলো।

আদালত ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙ্গা গ্রামের আছাদ মোল্যার ছেলে জিল্লুর মোল্যার সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন জিল্লুর। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রায়ই বিরোধ ও কলহ সৃষ্টি হতো।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ বিকেল ৩টার দিকে স্বজনেরা খবর পান, দুপুর ১টার দিকে স্বামীর বাড়িতে ওই নারী ‘গুল’ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। খবর পেয়ে তাঁরা আলফাডাঙ্গায় জিল্লুর মোল্যার বাড়িতে গিয়ে উঠানের একটি চৌকির ওপর ওই নারীর মরদেহ দেখতে পান।

এ ঘটনায় আলফাডাঙ্গা থানায় অপমৃত্যুর মামলা ও পরে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ তদন্তে নেমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে কাজ শুরু করে। মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন আলফাডাঙ্গা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নাজিমুদ্দিন।

তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, ওই নারীর মৃত্যু আত্মহত্যার কারণে হয়নি। বরং জোরপূর্বক তামাকজাত পদার্থ ‘গুল’ খাওয়ানোর ফলে অতিরিক্ত নিকোটিনের বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তে ভুক্তভোগীর শ্বাসনালি ও পরিপাকতন্ত্রে ‘গুল’-এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। চিকিৎসকের মতামত অনুযায়ী, বিষক্রিয়ার কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত গুরুতর জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

তদন্ত শেষে জিল্লুর মোল্যাকে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নাজিমুদ্দিন। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। এসব সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া রতন বলেন, যৌতুকের জন্য গৃহবধূকে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় আদালতের এ রায় দৃষ্টান্তমূলক। এর মাধ্যমে যৌতুকলোভী ও নির্যাতনকারীদের প্রতি বিচার বিভাগের কঠোর অবস্থানের বার্তা পৌঁছাবে।