
চুরি-ছিনতাই, অপহরণ, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও যানজটসহ শহরের নানা সমস্যা মোকাবিলায় এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে নওগাঁ পুলিশ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে ৬৪টি অত্যাধুনিক এআই-সক্ষম সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে চলছে ২৪ ঘণ্টার নজরদারি। পুলিশের দাবি, প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারির ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সহজ হয়েছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার অপরাধ দমনে নওগাঁ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে চালু করা হয়েছে ‘এআই কানেক্টেড ডিজিটাল সারভিলেন্স অ্যান্ড সাইবার ল্যাব’। এই ল্যাব থেকে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থাপন করা ক্যামেরাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো এলাকায় অপরাধ বা যানজটের পরিস্থিতি তৈরি হলে ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের গুরুত্ব বেড়েছে। এ কারণে তাঁর উদ্যোগে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী ও সুধীসমাজের সহযোগিতায় নওগাঁ শহরকে ৬৪টি অত্যাধুনিক এআই সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, চুরি-ছিনতাই, অপহরণ প্রতিরোধ ও যানজট নিয়ন্ত্রণে এসব ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শহরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হঠাৎ যানজট তৈরি হলে ক্যামেরার মাধ্যমে পরিস্থিতি দেখে দ্রুত সেখানে ট্রাফিক পুলিশ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। সম্প্রতি নওগাঁ শহরে শরীরে ময়লা ছিটিয়ে মানুষের সর্বস্ব লুটের একটি চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতেও ক্যামেরার ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাইসহ সংঘটিত অপরাধের তদন্তেও ক্যামেরার ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি ছোটখাটো চুরির ঘটনাতেও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নওগাঁ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, শহরের পুলিশিং কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিচালনায় সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যানজট দেখা দিলে ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি দেখে সেখানে ট্রাফিক পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। উচ্চ শব্দে বা বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর মতো ঘটনাতেও ক্যামেরার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণেও ক্যামেরাগুলো কাজে আসছে। পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে স্থাপিত এই ব্যবস্থা ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে নওগাঁ শহরে অপরাধ করে কেউ দ্রুত স্থান পরিবর্তন করলেও বিভিন্ন পয়েন্টের ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাকে শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শহরের ব্যবসায়ী ও নওগাঁ ফুড প্যালেসের স্বত্বাধিকারী মনোয়ার হোসেন লিটন বলেন, শহরজুড়ে ক্যামেরা স্থাপনের পর এর সুফল মানুষ পেতে শুরু করেছে। তাঁর দাবি, চুরি, ছিনতাই ও অপহরণের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতও কমেছে।

তিনি বলেন, নওগাঁ শহরের পাশাপাশি আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা গেলে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দায়িত্বে আসা কর্মকর্তারাও যেন এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, শহরবাসীর সহযোগিতা পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এআই ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থাপিত ক্যামেরাগুলো অক্ষত রাখা এবং কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করার ক্ষেত্রে নগরবাসীকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি ব্যবস্থা নওগাঁ শহরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ক্যামেরার পাশাপাশি নিয়মিত পুলিশি তৎপরতা, দ্রুত তদন্ত এবং আইন প্রয়োগের কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক নওগাঁ 


















