মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬,
১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুসংস্কারের করাল গ্রাসে আর কত প্রাণ?

  • প্রতিবেদকের নাম
  • প্রকাশের সময় : ১১:২৪:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২০২ বার পড়া হয়েছে

আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে আজও ঝাড়-ফুক, তন্ত্র-মন্ত্র আর তথাকথিত কবিরাজি চিকিৎসার বলি হয়ে মানুষের প্রাণ ঝরে পড়া নিঃসন্দেহে আমাদের সমাজের জন্য লজ্জাজনক ও ভীতিকর বাস্তবতা। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার তিলাবদূরী গ্রামে প্রতিবন্ধী যুবক জয়দেব দেবনাথের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই করুণ সত্যকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

ঘটনাটি নিয়ে ৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ‘আত্রাইয়ে কবিরাজের সাপের কামড়ে যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়, যা সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং কুসংস্কারবিরোধী অবস্থানের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। জন্মগতভাবে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী জয়দেবকে সুস্থ করার আশায় তার পরিবার যে অন্ধ বিশ্বাসের পথে পা বাড়িয়েছিল, তার পরিণতি যে এত ভয়াবহ হবে-তা হয়তো তারা নিজেরাও কল্পনা করতে পারেনি।

বেহুলা-লক্ষিণদারের পালা গান, ঝাড়-ফুক আর গলায় বিষধর সাপ পেঁচিয়ে ‘চিকিৎসা’-এসব যে সরাসরি মৃত্যুকে ডেকে আনে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ সেই নিষ্ঠুর ও অমানবিক কাণ্ড দিনের পর দিন চলেছে, আর শেষ পর্যন্ত এক তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এ ধরনের ভণ্ড কবিরাজরা আজও গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে নির্বিঘ্নে তাদের প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসে আছে। অসহায়, অশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষদের বিশ্বাসকে পুঁজি করে তারা শুধু অর্থ হাতিয়ে নেয় না, জীবন নিয়েও ছিনিমিনি খেলে। ঘটনার পর অভিযুক্ত কবিরাজের পালিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, সে জানত তার কাজ অপরাধ।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়-সে কীভাবে এতদিন প্রকাশ্যে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারল? এক্ষেত্রে শুধু কবিরাজই দায়ী নয়। সমাজের অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় তদারকির ঘাটতিও সমানভাবে দায়ী। প্রশাসনের নজরদারি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সচেতন ভূমিকা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর প্রচারণা থাকলে হয়তো এমন মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতো।

আমরা মনে করি, জয়দেবের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে কুসংস্কারবিরোধী সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা, গ্রামাঞ্চলে বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ভণ্ড কবিরাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

একটি সভ্য সমাজে অন্ধ বিশ্বাসের কারণে আর একটি প্রাণও যেন ঝরে না পড়ে-এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। জয়দেবের মৃত্যু যেন অন্তত আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।

ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখক সম্পর্কে

জনপ্রিয়

হৃদপিণ্ডে ছিদ্র ও খাদ্যনালী ব্লক: বাঁচতে চায় ১৩ মাসের শিশু অর্পিতা

কুসংস্কারের করাল গ্রাসে আর কত প্রাণ?

প্রকাশের সময় : ১১:২৪:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে আজও ঝাড়-ফুক, তন্ত্র-মন্ত্র আর তথাকথিত কবিরাজি চিকিৎসার বলি হয়ে মানুষের প্রাণ ঝরে পড়া নিঃসন্দেহে আমাদের সমাজের জন্য লজ্জাজনক ও ভীতিকর বাস্তবতা। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার তিলাবদূরী গ্রামে প্রতিবন্ধী যুবক জয়দেব দেবনাথের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই করুণ সত্যকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

ঘটনাটি নিয়ে ৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ‘আত্রাইয়ে কবিরাজের সাপের কামড়ে যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়, যা সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং কুসংস্কারবিরোধী অবস্থানের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। জন্মগতভাবে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী জয়দেবকে সুস্থ করার আশায় তার পরিবার যে অন্ধ বিশ্বাসের পথে পা বাড়িয়েছিল, তার পরিণতি যে এত ভয়াবহ হবে-তা হয়তো তারা নিজেরাও কল্পনা করতে পারেনি।

বেহুলা-লক্ষিণদারের পালা গান, ঝাড়-ফুক আর গলায় বিষধর সাপ পেঁচিয়ে ‘চিকিৎসা’-এসব যে সরাসরি মৃত্যুকে ডেকে আনে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ সেই নিষ্ঠুর ও অমানবিক কাণ্ড দিনের পর দিন চলেছে, আর শেষ পর্যন্ত এক তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এ ধরনের ভণ্ড কবিরাজরা আজও গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে নির্বিঘ্নে তাদের প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসে আছে। অসহায়, অশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষদের বিশ্বাসকে পুঁজি করে তারা শুধু অর্থ হাতিয়ে নেয় না, জীবন নিয়েও ছিনিমিনি খেলে। ঘটনার পর অভিযুক্ত কবিরাজের পালিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, সে জানত তার কাজ অপরাধ।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়-সে কীভাবে এতদিন প্রকাশ্যে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারল? এক্ষেত্রে শুধু কবিরাজই দায়ী নয়। সমাজের অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় তদারকির ঘাটতিও সমানভাবে দায়ী। প্রশাসনের নজরদারি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সচেতন ভূমিকা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর প্রচারণা থাকলে হয়তো এমন মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতো।

আমরা মনে করি, জয়দেবের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে কুসংস্কারবিরোধী সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা, গ্রামাঞ্চলে বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ভণ্ড কবিরাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

একটি সভ্য সমাজে অন্ধ বিশ্বাসের কারণে আর একটি প্রাণও যেন ঝরে না পড়ে-এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। জয়দেবের মৃত্যু যেন অন্তত আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।